জামালপুরে জ্বালানি তেল সংকট: কৃষক ও যাত্রীদের চরম ভোগান্তি
জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে স্থানীয় কৃষক ও যাত্রীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় ডিজেলের অভাবে চাষাবাদ ও সেচকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি, যাত্রীবাহী বাসগুলোর যাত্রা বাতিল হচ্ছে। এতে করে কৃষক ও দূরপাল্লার যাত্রীদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষকদের দীর্ঘ লাইন ও হতাশা
সরেজমিনে সরিষাবাড়ীতে দেখা গেছে, ডিজেল নিতে পাম্পগুলোতে কৃষকদের দীর্ঘ সারি লেগে আছে। ফজর নামাজের পর থেকেই তারা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, কারো হাতে তেল নেওয়ার ক্যান বা বোতল, আবার কেউ শ্যালো মেশিনের ফুয়েল ট্যাংক নিয়ে। স্থানীয় কার্ডধারী কৃষক আজমত আলী, দিদার আলী ও মোফাজ্জল হকসহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরেই কৃষি কার্ড নিয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরেও প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছি না। ভোররাত থেকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক সময় তেল না পাওয়ায় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।’
তারা আরো জানান, ডিজেল না থাকায় গত কয়েক দিন থেকে ডিজেল চালিত অধিকাংশ সেচ পাম্প বন্ধ রয়েছে। পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় ধানের চারা লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। কৃষকদের মতে, মাঠের এই ফাটল কেবল মাটির নয়, বরং তাদের বুক চেরা হাহাকারের প্রতীক। সোনালি স্বপ্নের বদলে এখন তাদের চোখমুখে কেবলই অন্ধকারের হাতছানি।
কৃষিকাজে মারাত্মক ব্যাঘাত
কৃষকরা উল্লেখ করেন, বর্তমানে মাঠে কৃষিকাজের ব্যস্ত সময় চলছে। জমি চাষ, সেচ এবং কৃষিযন্ত্র চালাতে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তেলের সংকটে শাকসবজি, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, পাওয়ার টিলার, ধান কাটার মেশিন ও ট্রাক্টর বন্ধ থাকায় অনেক জমির কাজ করতে পারছেন না তারা।
একজন কৃষক বলেন, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে যে টুকুও তেল পাওয়া যায়, তা একেবারে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এতে করে আমাদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
যাত্রীবাহী বাসের যাত্রা বাতিল
এদিকে, তেলসংকটের কারণে সরিষাবাড়ীতে বিভিন্ন গণপরিবহনের যাত্রা বাতিল হচ্ছে। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। একটি বাস কোম্পানির ম্যানেজার রাজু আহাম্মেদ বলেন, ‘তেলসংকটের কারণে আমরা ঠিক সময়মতো বাস সার্ভিস দিতে পারছি না। তেল আসলে একদিন আগে থেকেই পাম্পে বাসগুলো সিরিয়ালে রাখতে হয়, যার কারণে প্রায়ই যাত্রা বাতিল করতে হয়। এতে করে যাত্রীরা ভোগান্তি ও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।’
পাম্প মালিকদের বক্তব্য
নূরজাহান ফিলিং স্টেশনের মালিক মো. সুমন মিয়া জানান, ‘আমরা সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এই ডিজেল ট্রাক, বাস, বিভিন্ন যানবাহন ও কৃষকদের দেওয়া হয়। অনেক সময় লম্বা লাইনের কারণে তেল শেষ হয়ে গেলে সারা দিন লাইনে থাকার পরও অনেক কৃষককে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়, যা আমাদের জন্যই দুঃখজনক ও কষ্টকর।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘আবার অনেক সময় তেল না পেয়ে গ্রাহকেরা পাম্পে ভাঙচুরও চালায়, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।’
কৃষি কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ অনুপ সিংহ জানান, কৃষি খাতে সেচ প্রকল্প, ট্রাক্টর ও অন্যান্য মেশিনারিজ যন্ত্র চালানোর জন্য ডিজেল প্রয়োজন। সামনে ডিজেলের চাহিদা আরো বাড়বে এবং চাপ পড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘ডিজেলের সমস্যা অতি দ্রুত সমাধান হবে।’
তিনি আরো জানান, সব কৃষককে ফুয়েল কার্ডের জন্য কৃষি অফিসে আবেদন করতে বলা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক কৃষক আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই পদক্ষেপটি কৃষকদের জন্য সহায়ক হতে পারে, তবে তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি করা জরুরি।’
সরিষাবাড়ীর এই জ্বালানি তেল সংকট কৃষি উৎপাদন ও যাতায়াত ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা।



