ব্যাংকে মোট আমানতের ৪০ শতাংশই কোটিপতিদের হিসাবে, লাখপতিদের ৫৬ শতাংশ
ব্যাংকে মোট আমানতের ৪০% কোটিপতিদের, লাখপতিদের ৫৬%

ব্যাংকে আমানতের ৯৬ শতাংশই লাখপতি ও কোটিপতিদের দখলে

দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট আমানতের ৯৬ শতাংশই রয়েছে লাখপতি ও কোটিপতি হিসাবধারীদের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের সব ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে, এমন হিসাবগুলোতে (কোটিপতি) রয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, যা মোটের ৩৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে, ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা জমা থাকা (লাখপতি) হিসাবে রয়েছে ১২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোটের প্রায় ৫৬ শতাংশ।

হাজার টাকার হিসাবের সংখ্যা বেশি, জমা কম

বিপরীতে, ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৯০ শতাংশই হাজার টাকার হিসাব, কিন্তু এসব হিসাবে জমা আছে মাত্র ৪ শতাংশ। ১ টাকা থেকে ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা থাকা হিসাবগুলোতে ছিল ৮৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের মাত্র ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানত হিসাব রয়েছে ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। এর মধ্যে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে, এমন হিসাবের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি; ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার কম জমা রয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ১৮০টি; আর ১৬ কোটি ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫০টি হিসাবে জমা ১ টাকা থেকে ১ লাখ টাকার কম।

কোটিপতি হিসাব ও জমা বেড়েছে

সাম্প্রতিক তিন মাসেও নতুন আমানতের বড় অংশ গেছে কোটিপতি হিসাবে। গত ডিসেম্বর শেষে কোটিপতি হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩ মাসে এসব হিসাবে জমা বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা এবং ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৭ লাখ। অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে মার্চ—এই তিন মাসে ব্যাংকে যে নতুন আমানত এসেছে, তার প্রায় অর্ধেকই যুক্ত হয়েছে কোটিপতি হিসাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শতকোটিপতি হিসাবের গড় জমা ১৪৮ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৪টি। এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মার্চ শেষে এই ধরনের প্রতিটি হিসাবে গড়ে জমা ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা। ফলে এসব হিসাবের বড় অংশই ছিল শতকোটিপতিদের। কোটিপতি হিসাবধারীদের মধ্যে ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও।

প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের প্রাধান্য

বিশ্লেষক ও ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকে ব্যক্তি হিসাবের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও থাকে। ব্যক্তি হিসাবে যে অর্থ জমা থাকে, তার কয়েক গুণ বেশি অর্থ জমা থাকে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে। বিশেষ করে সরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন প্রকল্পের বিপুল অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হয়। এ কারণে হাজার টাকার হিসাবের তুলনায় লাখ বা কোটি টাকার হিসাবে অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। যদিও হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত হিসাবই বেশি। আবার ব্যক্তিপর্যায়েও যাঁদের কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে, তাঁদের অনেকে কোম্পানির নামে অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন। ফলে লাখপতি ও কোটিপতি হিসাবেই জমা অর্থের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন প্রান্তিক শেষে ব্যাংক হিসাব ও তাতে জমা অর্থের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তাতে ব্যক্তির হিসাব যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক হিসাবও। ব্যক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে বেশি অর্থ জমা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।”

কোটিপতি হিসাবের মধ্যেও তারতম্য

গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ—এই তিন মাসে ব্যাংকে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ও জমা অর্থ দুটিই বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি, যা মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টিতে। অর্থাৎ ৩ মাসে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ২ হাজার ৪৪১টি। তবে এই প্রবৃদ্ধি সব শ্রেণিতে সমান নয়। সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে, এমন হিসাবগুলোতে। ডিসেম্বর শেষে এই শ্রেণির হিসাব ছিল ১ হাজার ৯৯৭টি, যেখানে জমা অর্থ ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এসব হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৪টিতে আর জমা অর্থ বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩ মাসে এই শ্রেণিতে জমা অর্থ বেড়েছে ২৪ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা, যা পুরো কোটিপতি শ্রেণির বৃদ্ধির প্রধান অংশ।

অন্যদিকে, কোটিপতিদের কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণিতে আমানত কমেছে। যেমন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা জমা রয়েছে এমন হিসাবে। ডিসেম্বর শেষে এই শ্রেণির হিসাবের জমা অর্থ ছিল ৩৯ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই শ্রেণিতে কমেছে ১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা, ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা, ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা জমা রয়েছে, এমন শ্রেণির হিসাবেও ৩ মাসের ব্যবধানে অর্থের পরিমাণ কমে গেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নির্বাচনকালীন সময় ও পবিত্র ঈদুল ফিতর ছিল। নির্বাচনকে ঘিরে অনেক অর্থ ব্যাংকের বাইরে চলে যায়। ঈদকে কেন্দ্র করেও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের ওপর আমানতকারীদের আস্থার ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করছেন।”

ছোট হিসাবে জমা কমেছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থ রয়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জমা আছে, এমন ব্যাংক হিসাবে। গত মার্চ শেষে এই ধরনের হিসাবে মোট জমা অর্থ ছিল ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ৪ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এই শ্রেণিতে জমা অর্থ কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে এই শ্রেণির হিসাবের সংখ্যাও কমেছে। ডিসেম্বর শেষে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জমা রয়েছে, এমন হিসাব ছিল ৬৩ লাখ ৪১ হাজার ৬১৮টি, যা মার্চ শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১টিতে।

অন্যদিকে, ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি হিসাব ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা আছে এমন হিসাবে। গত মার্চ শেষে এই শ্রেণির হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৯৩ হাজার ৫১২টি, যেখানে মোট জমা অর্থ ছিল ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই ধরনের হিসাব ছিল ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫টি এবং জমা অর্থ ছিল ৭ হাজার ৬৫ কোটি টাকা।

বিশ্লেষক ও ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকে সাধারণ মানুষের হিসাবের সংখ্যা বেশি হলেও এসব হিসাবে তুলনামূলকভাবে কম অর্থ থাকে। এই শ্রেণির অধিকাংশ মানুষ শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী বা স্বল্প আয়ের মানুষ। তাঁরা বেতন বা দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য ব্যাংক ব্যবহার করেন, কিন্তু বড় অঙ্কের সঞ্চয় সাধারণত করেন না।