বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) পুনরায় ফিরতে পারবেন না। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।
বিভ্রান্তি নিরসনে ব্যাখ্যা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংক খাত সংস্কার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অধ্যাদেশের কিছু ধারা নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অতীতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবেই এ অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের তথ্য উপস্থাপনায় প্রশ্ন
আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ব্যাংক খাত সংস্কার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অধ্যাদেশের কিছু ধারা নিয়ে গণমাধ্যমে যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে অতীতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে বিতর্কিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোর পুনরায় ব্যাংকের মালিকানা বা পরিচালনায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে কিনা— এমন আশঙ্কা সামনে এসেছে।
অধ্যাদেশের শর্ত ও প্রক্রিয়া
তিনি ব্যাখ্যা করেন, অধ্যাদেশে উল্লিখিত শর্ত অনুযায়ী, অতীতে কোনো ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিচালক বা স্পন্সররা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (সাড়ে ১২ শতাংশ) পরিশোধ করে মালিকানায় ফেরার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এটি কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয় বা নির্বিচার সুযোগ নয়। বরং পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর যাচাই-বাছাই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে।
অভিযোগ যাচাই-বাছাই
আরিফ হোসেন খান বলেন, কেউ যদি পুনরায় ব্যাংকের বোর্ডে ফিরতে চান, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছ থেকে অর্থ পাচার বা সন্দেহজনক লেনদেন সংক্রান্ত রিপোর্ট চাওয়া হবে। যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ থেকে থাকে, তবে সেই অভিযোগ থেকে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
আর্থিক ইতিহাসও খতিয়ে দেখা হবে
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়াই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক আচরণ, বিশেষ করে ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের ইতিহাসও খতিয়ে দেখা হবে। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ থাকলে তা নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় বা নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ পাওয়া কঠিন হবে।
আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি প্রয়োজন
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, অতীতে যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, যেমন- নামে-বেনামে ঋণ গ্রহণ, সেই ঋণের অপব্যবহার, বিদেশে অর্থ পাচার এবং ব্যাংকের অর্থ ফেরত না দেওয়া—এসব অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারে এবং আর্থিক দায়-দেনা পরিশোধ করে, তাহলে তাদের পুনরায় ব্যাংক খাতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের আপত্তি থাকার কথা নয়।
কোনো ছাড় বা বিশেষ সুবিধা নেই
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ছাড় বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি আবেদনই কঠোর যাচাই-বাছাই, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে। ফলে ব্যাংক খাতকে পুনরায় ঝুঁকির মুখে ফেলার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অবস্থান একদিকে যেমন ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়, অপরদিকে বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর পুনঃপ্রবেশ ঠেকাতে নিয়ন্ত্রকের সতর্ক মনোভাবও স্পষ্ট করে। তবে বাস্তবে এই নীতিমালার প্রয়োগ কতটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



