মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয়ের পর থেকেই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসিদের শিরোপা ধরে রাখার পথ সহজ করে দিতে ফিফা পক্ষপাত করছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো হয়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবু একের পর এক ঘটনা সামনে এনে বিতর্ক উসকে দিচ্ছেন সমালোচকরা।
রেফারিং নিয়ে বিতর্ক
এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল বাতিল না করা এবং মিসরের মোস্তফা জিকোর একটি গোল বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে রেফারিং নিয়ে। ম্যাচ শেষে জিকো পর্যন্ত অভিযোগ করেন, বিশ্বকাপ ফিক্স করা! যদিও এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তারপরও সামাজিক মাধ্যমে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত।
মেসির লাল কার্ড না দেখা
আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন মেসি। তবে ম্যাচের ৩২ মিনিটে আইসা মান্দির পায়ে বুট দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পোলিশ রেফারি সিমন মারচিনিয়াক ফাউলই দেননি। ভিএআরও ঘটনাটিকে লাল কার্ডের মতো গুরুতর অপরাধ মনে করেনি। ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে অনেক সাবেক ফুটবলার ভিন্ন মত দিয়েছেন। সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার নেদুম ওনুওহা বলেছেন, ‘আমার মতে, এটা সরাসরি লাল কার্ড হওয়ার মতো অপরাধ।’ সাবেক ভেনেজুয়েলা ফরোয়ার্ড আলেহান্দ্রো মোরেনোর মন্তব্য, ‘এটি শতভাগ লাল কার্ড ছিল।’ সমালোচকদের দাবি, একই ধরনের ট্যাকলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখলেও মেসি কোনো শাস্তিই পাননি।
কম কার্ড, বেশি ফাউল
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তুলনামূলক বেশি ফাউল করলেও কার্ড দেখেছে খুব কম। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ১৩টি ফাউল করেও কোনো কার্ড দেখেনি তারা। জর্ডানের বিপক্ষেও একই চিত্র দেখা যায়। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষেও ম্যাচের যোগ করা সময় পর্যন্ত কোনো দলই কার্ড দেখেনি। তবে ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের পর অল্প সময়ের মধ্যে মিসরের চার খেলোয়াড় ও কোচ হোসাম হাসান কার্ড দেখেন। কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠা আট দলের মধ্যে আর্জেন্টিনার কার্ডসংখ্যা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, যদিও ফাউলের দিক থেকে তারা শীর্ষ চার দলের একটি।
ফিফা সভাপতির মন্তব্য
কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচের পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আর্জেন্টাইন টেলিভিশনকে নিজের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনার জন্য ম্যাচটা দেখে অনেক ভুগেছি।’ পরে অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা দেন, নিরপেক্ষ সমর্থক হিসেবে দুই দলের জন্যই কথাটি বলেছেন। তবে সেই মন্তব্যও সামাজিক মাধ্যমে পক্ষপাতের অভিযোগকে আরও উসকে দিয়েছে।
ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে আর্জেন্টাইন ম্যাচ অফিসিয়াল
ফ্রান্স ও মরক্কোর কোয়ার্টার-ফাইনালের জন্য পাঁচজন অন-ফিল্ড ম্যাচ অফিসিয়াল আর্জেন্টিনার হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেকের মতে, ফ্রান্সকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ধরা হলেও এমন নিয়োগ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফিফার ঘোষণাটি সামাজিক মাধ্যমে কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে।
ড্র নিয়েও অভিযোগ
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ড্র নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে এমনভাবে বাছাই করা হয় যাতে সেমিফাইনালের আগে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। সমালোচকদের দাবি, এতে তুলনামূলক সহজ পথ পেয়েছে আর্জেন্টিনা।
নতুন নয় এমন অভিযোগ
২০২২ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। নেদারল্যান্ডসের সাবেক কোচ লুই ফন গাল ২০২৩ সালে দাবি করেছিলেন, পুরো বিষয়টি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল এবং মেসিকেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানানোর লক্ষ্য ছিল। তবে সেই দাবির পক্ষেও কখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
১৯৭৮ বিশ্বকাপের বিতর্ক
আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসও বিতর্কমুক্ত নয়। স্বাগতিক হিসেবে সামরিক শাসনের সময় পেরুকে ৬-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর থেকেই ম্যাচটি নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালে পেরুর সাবেক সিনেটর জেনারো লেদেসমা আদালতে দাবি করেন, তৎকালীন দুই দেশের শাসকদের মধ্যে গোপন সমঝোতা হয়েছিল। তবে সেই অভিযোগও কখনো প্রমাণিত হয়নি।
১৯৯০ বিশ্বকাপেও বিতর্ক
১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কো অভিযোগ করেন, আর্জেন্টিনার মেডিকেল স্টাফের দেওয়া বোতল থেকে পানি পান করার পর তিনি অসুস্থ বোধ করেন। বহু বছর পরে আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো বিষয়টি সরাসরি অস্বীকারও করেননি। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন বিষয়টি তদন্তের দাবি তুললেও ফিফা কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।



