চট্টগ্রাম নগরের শমসেরপাড়া এলাকায় ছয় দিন ধরে পানির নিচে ডুবে আছে রেলপথ। পানিতে রেলপথ ডুবে থাকায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এত লম্বা সময়ের জন্য ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার ঘটনা এবারই প্রথম।
দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণ
শুধু অতি ভারী বৃষ্টি নয়, ৮ বছর আগে ১১০ কোটি টাকার রেললাইন সংস্কার প্রকল্পে নিচু রেলপথ উঁচু না করা, তিন দশক আগে করা ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৪ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত রেলপথের বিভিন্ন অংশ দেড় থেকে দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে ওই দিন থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। আজ রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি।
পানি নিষ্কাশনে ব্যর্থতা
গতকাল শনিবার সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় পানি নেমে গেলেও শমসেরপাড়ায় প্রায় ২০০ মিটার অংশে প্রায় ৯ ইঞ্চি করে পানি ছিল। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত পানির গভীরতা ৬ ইঞ্চির নিচে না নামলে ওই পথে ট্রেন চালানো হয় না।
এই রুটে চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া এবং ঢাকা থেকে দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটক, চাকরিজীবী ও নিয়মিত যাত্রীদের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়েছে।
পূর্ববর্তী ঘটনা
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ফেনী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সময় ফেনী থেকে হাসানপুর পর্যন্ত রেললাইন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় চার দিন চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ২০২৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণাধীন রেলপথের একটি অংশ বন্যার পানিতে ডুবে গিয়েছিল। এ সময় পাথর ও মাটি সরে রেললাইন বেঁকে যায়।
অবকাঠামোগত ত্রুটি
রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেলপথের পাশে নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, জলাশয় ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়া, লাইনের পাশে খালের প্রতিরোধদেয়াল উঁচু হওয়া, নতুন খাল খনন না করা এবং বন্যার পানি ধরে রাখার জলাধার নির্মাণ না হওয়ায় এবার পানি দ্রুত নামতে পারেনি।
রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন প্রথম আলোকে বলেন, “এভাবে দীর্ঘ সময় রেললাইনে পানি জমে থাকার ঘটনা আগে দেখা যায়নি। এলাকাটি নিচু। একসময় আশপাশে বিল ও জলাশয় ছিল, যার অনেকগুলো ভরাট হয়ে গেছে। খালের প্রতিরোধদেয়ালও উঁচু করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি আটকে আছে।”
নতুন প্রকল্পে পাঁচ ফুট উঁচু হবে রেলপথ
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের পর এবার চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে চট্টগ্রাম নগরের নিচু অংশের রেললাইন প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে।
গত বুধবার তলিয়ে যাওয়া রেলপথ পরিদর্শনের সময় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, “দরপত্রপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রেললাইন উঁচু হলে ভবিষ্যতে ভারী বৃষ্টির সময়েও ট্রেন চলাচল ব্যাহত হবে না।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিদ্যমান রেলপথ নির্মাণে কোনো ত্রুটি নেই।
ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা অকার্যকর
১৯৯৫ সালে প্রণীত চট্টগ্রাম নগরের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় শমসেরপাড়াসহ আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে রেললাইনের সমান্তরালে নতুন একটি খাল খননের সুপারিশ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রায় ২০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বন্যার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য একটি জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু প্রায় তিন দশকেও এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
সিডিএর উপপ্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী প্রথম আলোকে বলেন, “বর্তমানে থাকা নোয়া খাল পানিনিষ্কাশনের জন্য যথেষ্ট নয় বলেই নতুন খালের সুপারিশ করা হয়েছিল। পাশাপাশি জলাধার থাকলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সেখানে ধরে রাখা যেত। তাহলে শমসেরপাড়ার রেললাইন ও আশপাশের বসতি এলাকায় কয়েক দিন ধরে পানি আটকে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম থাকত।”



