মরক্কো বিশ্বকাপ জিততে পারে: কেন এই বিশ্বাস এখন আর অমূলক নয়?
মরক্কো বিশ্বকাপ জিততে পারে: কেন এই বিশ্বাস এখন অমূলক নয়?

স্বাগতিক কানাডাকে হারিয়ে মরক্কো দলের উল্লাস। ৪ জুলাই, টেক্সাস। ছবি: রয়টার্স

আমরা বিশ্বকাপ জয় করতে পারি—এ কথা যখন প্রথম শুনেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল শব্দ চয়নে মরক্কোর কোচের আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। ফুটবল দুনিয়ায় এটা সবাই জানেন যে, প্রত্যেক কোচই চান তাঁর খেলোয়াড়েরা নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখুক। কিন্তু বিশ্বকাপ বড় বড় অনেক ভবিষ্যদ্বাণী ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। কঠিন গ্রুপ পর্ব আর নকআউটের নির্মম সমীকরণ সামনে রেখে আমি ভাবছিলাম—কোচ মোহামেদ ওয়াহবির এই সাহসী উচ্চারণ শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্যই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে না তো?

গ্রুপ পর্বের তিনটি আর নকআউটের দুটি ম্যাচ পেরিয়ে আসার পর এখন আমি নিজেই সেই সাহসী কথাটার পুনরাবৃত্তি করছি না, বরং আরও বড় দাবি তুলছি: মরক্কো এবার বিশ্বকাপ জিততে পারে এবং আগামী বহু বছর ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসন করতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাতার বিশ্বকাপ পরবর্তী স্বপ্ন

ফুটবল মাঝে মাঝে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে রূপকথা উপহার দেয়। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার ফাইনাল খেলা ছিল তেমনই এক উদাহরণ। ঠিক যেমন আমার নিজের দেশ মরক্কো ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সবাইকে চমকে দিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল।

কাতার বিশ্বকাপের সেই সাফল্য কেবল মরক্কোকে প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নই দেখায়নি, বরং দেশের মানুষের মনে প্রত্যাশার পারদ এতটাই চড়িয়ে দিয়েছিল যে ২০২৬-এর আসরে মরক্কো পুরো পথটাই পাড়ি দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে চলমান বিশ্বকাপ যখন কোয়ার্টার ফাইনাল পর্বে রূপ নিতে যাচ্ছে, তখন মরক্কোর বিশ্বজয়ের ব্যাপারে আমার এই বিশ্বাসের ভিত্তি খুবই সাধারণ—এই টুর্নামেন্টে দলটি ইতিমধ্যেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো সব গুণাবলীর প্রমাণ দিয়েছে। যার ফলে, এবারের আসরে এক নতুন চ্যাম্পিয়ন পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডাচদের বিপক্ষে আধিপত্য

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে মাত্র এক ধাপ নিচে (অষ্টম) থাকা সত্ত্বেও, ফেবারিট নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে জয়টি ছিল অ্যাটলাস লায়নদের (মরক্কো) জন্য টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ম্যাচ।

মরক্কোর শক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ডাচরা তাদের চিরচেনা ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শন বিসর্জন দিয়ে রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলতে বাধ্য হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়। মরক্কো অবশ্য অতিরিক্ত সময়েই জিতে যেতে পারত। তবে তারা মাথা ঠান্ডা রেখে এক অদ্ভুত টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয়, যেখানে দুই দলই বেশ কয়েকটি পেনাল্টি মিস করেছিল।

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় পরিসংখ্যান ছিল—খেলার সিংহভাগ সময় মরক্কো ম্যাচটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আক্রমণাত্মক দল ডাচদের বিপক্ষে ৭০ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল তারা।

ওয়াহবি যখন বলেছিলেন মরক্কো বিশ্বকাপ জিততে পারে, আমার মনে হয়েছিল তিনি আমাদের কেবল বিশ্বাস রাখতে বলছেন। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, তিনি আসলে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বমানের দলটির সক্ষমতার কথাই বলছিলেন। এমন একটি দল, যারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সামর্থ্য রাখে।

আলি আল গার্‌নি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন; বিশেষ করে ইউরোপীয় ও উত্তর আফ্রিকান ফুটবল নিয়ে সাংবাদিকতা করেন।

সহ-আয়োজকদের বিদায়

নেদারল্যান্ডসকে হারানো যদি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিকার হয়, তবে শেষ ১৬-এর ম্যাচে সহ-আয়োজক কানাডার বিপক্ষে জয়টি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধরনের ম্যাচগুলোই দলের চরিত্র ও মানসিক দৃঢ়তা ফুটিয়ে তোলে, যা একটি ভালো দলকে সেরা দলে রূপান্তর করে। ৩-০ ব্যবধানের সেই জয়ে ছিল এক নির্মম কার্যকারিতা, কোচের দুর্দান্ত রণকৌশল, বেঞ্চের শক্তি এবং এক ধরণের ধৈর্য—যা দিয়ে কানাডার মতো গতিময় ও শারীরিক ফুটবল খেলা দলকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

বিশ্বকাপজয়ীদের মধ্যে সাধারণত এই গুণগুলো থাকে এবং মরক্কো ২০২৬ বিশ্বকাপে তা অবিশ্বাস্য গতিতে নিজেদের মধ্যে ঝালিয়ে নিচ্ছে। ম্যাচ বাই ম্যাচ দলের এই দ্রুত উন্নতিই প্রমাণ করে, কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বকে মোহিত করা দলটির চেয়ে এই মরক্কো দল অনেক বেশি শক্তিশালী। কাতারে আমরা রক্ষণ আগলে ইতিহাস গড়েছিলাম—আর এবার আমরা ফুটবল খেলে ইতিহাস লিখছি।

শুধু রক্ষণ নয়

অবশ্য নিরেট রক্ষণভাগ ছাড়া ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। তাই রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা এখনো মরক্কোর মূল শক্তির জায়গা। তবে বর্তমান মরক্কো অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে।

তাদের মাঝমাঠ এখন বল দখলে অনেক বেশি পরিণত। আক্রমণগুলো যেমন গোছানো, তেমনি ফরোয়ার্ড লাইনে রয়েছে বৈচিত্র্য ও ধার। এই দল এখন আর শুধু কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা ম্যাচের গতি ঠিক করতে পারে, প্রয়োজনে হাই-প্রেস করে খেলে, আবার সুযোগের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষাও করতে পারে।

একই সঙ্গে বর্তমান দলটির স্কোয়াড ডেপথ (খেলোয়াড়দের বিকল্প শক্তি) অনেক বেশি। চার বছর আগে মূল একাদশের ১১ জনকেই পুরো চাপ নিতে হতো। আজ চিত্রটা ভিন্ন। নকআউটে কানাডার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় গোলের আক্রমণটি শুরু করেছিলেন বদলি খেলোয়াড় শেমশাদিন তালবি, যা পূর্ণতা পায় রিয়াল মাদ্রিদের তারকা মিডফিল্ডার ব্রাহিম দিয়াজের পা হয়ে এবং গোলটি করেন আরেক বদলি খেলোয়াড় সোফিয়ান রাহিমি।

ফেবারিটদের বিপক্ষে আসল পরীক্ষা

ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে এখনো তিনটি ম্যাচ জেতা বাকি। কোচ ওয়াহবির মতো আমিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি মরক্কো পারবে। তবে বোস্টনে বৃহস্পতিবারের কোয়ার্টার ফাইনালে টুর্নামেন্টের হট ফেবারিট ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে এই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

অনেকের কাছে এটি ২০২২ সালের সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তি। কিন্তু আমি এটিকে ভিন্নভাবে দেখি। ‘প্রতিশোধ’ শব্দটা পত্রিকার শিরোনামের জন্য ভালো হতে পারে, কিন্তু তা মাঠের লড়াইয়ে কোনো কাজে আসে না। আসল বিষয় হলো, মরক্কো দেখাতে পারবে কিনা যে দুই দেশের মধ্যকার প্রতিভার ব্যবধান সত্যিই কমে এসেছে। ফ্রান্সকে হারালেই কাতারের ক্ষত মুছে যাবে না, তবে তা বিশ্ব ফুটবলের অভিজাতদের কাতারে মরক্কোর অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করবে।

অ্যাটলাস লায়নরা যদি ফ্রান্সের বাধা পার হতে পারে, তবে সেমিফাইনালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে স্পেন বা বেলজিয়াম। এই দুই প্রতিপক্ষের কাউকেই মরক্কোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কাতারে মরক্কো এই দুটি দলকেই বিদায় করেছিল; স্পেনকে শেষ ১৬-তে এবং বেলজিয়ামকে গ্রুপ পর্বে।

সেই জয়গুলো দলের মানসিকতায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। মরক্কো এখন আর ইউরোপের পরাশক্তিদের চমকে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে না—তারা জেতার জন্যই লড়াই করে।

মরক্কো ফাইনালে উঠলে ড্রয়ের অন্য প্রান্ত থেকে আসতে পারে আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, নরওয়ে কিংবা সুইজারল্যান্ড। চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা অতুলনীয় হলেও, সম্প্রতি কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে তাদের হোঁচট খাওয়া এবং শেষ ১৬-তে মিশরের বিরুদ্ধে বিতর্কিত জয় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগের বড় দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, ইংল্যান্ড হতে পারে মরক্কোর জন্য কৌশলে সবচেয়ে সুবিধাজনক প্রতিপক্ষ। মরক্কোর জমাট রক্ষণ ও গতিময় কাউন্টার অ্যাটাক ইংল্যান্ডের মাঝেমধ্যে তৈরি হওয়া মন্থর ও সৃজনশীলতাহীন ফুটবলকে ধসিয়ে দিতে সক্ষম।

এসবের কোনো কিছুই মরক্কোর ট্রফি জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। বিশ্বকাপ মাঝে মাঝে ভীষণ অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ নেয়। কে ভেবেছিল ব্রাজিল নরওয়ের কাছে কিংবা জার্মানি প্যারাগুয়ের কাছে হেরে যাবে? কিন্তু একটা সময় আসে যখন বিশ্বাস কেবল আবেগে নয়, প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।

উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ

বহু বছর ধরে মরক্কো ফুটবলের পরাশক্তিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার স্বপ্ন দেখেছে। কাতারে তারা প্রমাণ করেছে যে তারা বিশ্বমঞ্চের যোগ্য। কিন্তু এবার তাদের সামনে আরও বড় কিছুর সুযোগ এসেছে—বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের এক দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

কাতারে আমরা ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলাম—আর এবার আমরা বিশ্বকে জয় করতে চাই। তাই তখনকার আর এখনকার মধ্যে পার্থক্যটা শুধু কৌশলের নয়—মানসিকতারও।

কোচ ওয়াহবি যখন বলেছিলেন মরক্কো বিশ্বকাপ জিততে পারে, আমার মনে হয়েছিল তিনি আমাদের কেবল বিশ্বাস রাখতে বলছেন। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, তিনি আসলে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বমানের দলটির সক্ষমতার কথাই বলছিলেন। এমন একটি দল, যারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সামর্থ্য রাখে।

আলি আল গার্‌নি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন; বিশেষ করে ইউরোপীয় ও উত্তর আফ্রিকান ফুটবল নিয়ে সাংবাদিকতা করেন। আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।