ফুটবলে লিওনেল মেসি বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—রেফারিরা তাঁদের প্রতি তুলনামূলক বেশি সহনশীল থাকেন। বাস্তবে এ ধারণার কিছুটা সত্যতা থাকলেও বিষয়টি মোটেও এতটা সরল নয়। সাবেক রেফারিদের মতে, সুপারস্টাররা কখনও কখনও 'মার্জিনাল' সিদ্ধান্তে সুবিধা পেয়ে থাকেন, তবে তা অনেক সমর্থকের ধারণার মতো বড় পরিসরে নয়।
একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। মাঠে বা মাঠের বাইরে এসব তারকা যা-ই করেন, তা অন্য যে কোনো ফুটবলারের তুলনায় অনেক বেশি আলোচিত হয়। ফলে তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয় বহুগুণ বেশি।
মেসির ট্যাকল নিয়ে নতুন বিতর্ক
চলমান বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসির একটি ট্যাকল সেই আলোচনাকেই নতুন করে সামনে আনে। আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার আইসা মান্দির ওপর করা ওই চ্যালেঞ্জকে কেউ অসাবধানী, কেউ বেপরোয়া, আবার কেউ বিপজ্জনক হিসেবে দেখছেন। অনেকে এটিকে এমন আরেকটি ঘটনা বলেও উল্লেখ করছেন, যেখানে মেসি এমন একটি অপরাধের জন্য বড় শাস্তি এড়িয়ে গেছেন, যেটির জন্য অন্য কোনো খেলোয়াড়কে কঠিন শাস্তি পেতে হতে পারত।
তবে সাবেক রেফারিদের বিশ্লেষণ বলছে, মাঠে থাকা অধিকাংশ রেফারিই এ ঘটনার জন্য সরাসরি লাল কার্ড দেখাতেন না। কারণ, ট্যাকলটিতে ইচ্ছাকৃত আঘাত বা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের স্পষ্ট প্রমাণ ছিল না। ম্যাচটির দায়িত্বে ছিলেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের রেফারি শিমন মারচিনিয়াক। অভিজ্ঞ এ পোলিশ রেফারি ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখে সেটিকে গুরুতর ফাউল হিসেবে বিবেচনা করেননি।
আলজেরিয়ার খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া
এ ক্ষেত্রে আলজেরিয়ার খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাধারণত ইচ্ছাকৃত আঘাতের ঘটনায় সতীর্থরা রেফারিকে ঘিরে প্রতিবাদ করেন এবং ভিএআরের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। কিন্তু এই ঘটনায় তেমন কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এটিও একটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। কারণ, মাঠের খেলোয়াড়রা যখন কোনো সিদ্ধান্ত বদলের দাবি জোরালোভাবে তোলেন না, তখন অপ্রয়োজনীয়ভাবে খেলা থামিয়ে দীর্ঘ সময় ভিডিও পর্যালোচনা করায় ভিএআর কর্মকর্তারা প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়েন।
অবশ্য রিপ্লেতে ঘটনাটি আরও জটিল মনে হয়েছে। ধীরগতির ভিডিওতে দেখা যায়, মেসির বুটের স্টাড মান্দির পায়ের কাফে লাগে। এতে মান্দি ব্যথা পান বলেই মনে হয়েছে। এ কারণে কিছু ভিএআর কর্মকর্তা চাইলে রেফারিকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখতে বলতে পারতেন। সেক্ষেত্রে মারচিনিয়াক ধীরগতির রিপ্লে দেখে লাল কার্ডও দেখাতে পারতেন।
ফিফার আইন ও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা
তবে ফিফার আইন অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে হলে প্রমাণ থাকতে হবে যে খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলেছেন অথবা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছেন। বাস্তব গতিতে ঘটনাটি দেখলে সেটি ইচ্ছাকৃত বা অতিমাত্রায় শক্তিশালী ট্যাকল বলে মনে হয়নি। ফলে ফ্রি-কিক দেওয়াই যথেষ্ট ছিল। মান্দি চিকিৎসাও নেননি, যা লাল কার্ডের পক্ষে যুক্তিকে আরও দুর্বল করেছে।
সাবেক রেফারিদের একজনের মতে, তিনি মাঠে থাকলেও মারচিনিয়াকের মতোই শুধু ফ্রি-কিক দিতেন। তবে পরে রিপ্লে দেখে তার উপলব্ধি হয়েছে, অন্তত একটি হলুদ কার্ড দেওয়া উচিত ছিল। আর যদি তিনি ভিএআরের দায়িত্বে থাকতেন, তাহলে প্রথমে কোন অ্যাঙ্গেলের রিপ্লে দেখানো হচ্ছে, সেটিই সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলত। ইংল্যান্ডে প্রচলিত ভিএআর প্রটোকল অনুযায়ী, এমন ট্যাকল প্রথমে পূর্ণ গতিতে এবং দূরের ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি লাল কার্ডে হস্তক্ষেপ করার মতো ঘটনা মনে হওয়ার সম্ভাবনা কম।
উল্টো ঘটনা হলে কী হতো?
প্রশ্ন উঠতে পারে, একই ঘটনা যদি উল্টো হতো—অর্থাৎ মেসিই যদি এমন ট্যাকলের শিকার হতেন—তাহলেও কি একই সিদ্ধান্ত হতো? এর নিশ্চিত উত্তর দেওয়া কঠিন। রেফারিদের দায়িত্ব নিরপেক্ষ থাকা হলেও বাস্তবে খেলোয়াড়ের পরিচিতি, ব্যক্তিত্ব কিংবা অতীতের ভাবমূর্তি অনেক সময় অজান্তেই সিদ্ধান্তে সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে কিংবদন্তি ফুটবলারদের ক্ষেত্রে ভুলবশত লাল কার্ড দেখানোর পর যে তীব্র সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হয়, সেটিও রেফারিদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এর উদাহরণ হিসেবে সাবেক ইংলিশ রেফারি মাইকেল অলিভারের ঘটনা তুলে ধরা হয়। ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনকে লাল কার্ড দেখানোর পর অলিভারের স্ত্রী পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ঘৃণামূলক বার্তার শিকার হন। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি সেই চাপ এড়াতে পারেননি।
তবে এ ধরনের সম্ভাব্য পক্ষপাত বড় সিদ্ধান্তে নয়, বরং এমন সব ঘটনায় দেখা দিতে পারে যেখানে দুই ধরনের সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, মারচিনিয়াক একই ধরনের ট্যাকলে মেসি ভুক্তভোগী হলেও সম্ভবত একই সিদ্ধান্তই দিতেন।
তারকা সংস্কৃতি ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো তারকাদের ঘিরে যে ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তাতে অনেক সময় নিরপেক্ষ আলোচনা কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের চেয়ে একপক্ষ নেওয়াই বেশি জনপ্রিয়তা পায়।
এ ঘটনার পর আবারও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মেসির ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবলের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। সেই ঘটনায় তিনি হলুদ কার্ড পাননি। যদিও সেটিও এমন একটি 'মার্জিনাল' সিদ্ধান্ত ছিল, কারণ হ্যান্ডবলটি প্রতিপক্ষের সম্ভাবনাময় আক্রমণ ঠেকায়নি। তবে ঘটনাটি ছিল স্পষ্ট ও কৌশলী। ফলে পরবর্তী সময়ে আরেকটি ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড পেলেও সেটিই ছিল তার প্রথম সতর্কবার্তা।
অন্যদিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ ট্যাকলটি ছিল আরও ধূসর অঞ্চলের একটি ঘটনা। অধিকাংশ দর্শক সেটি ধীরগতির রিপ্লে বা স্থিরচিত্রে দেখেছেন, কিন্তু রেফারিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বাস্তব গতিতে। ফলে দর্শক ও রেফারির মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক।
সবশেষে সাবেক রেফারিদের বক্তব্য, খেলোয়াড়রা প্রায়ই দাবি করেন যে তারা শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত চান। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তারা রেফারিকে ঘিরে ধরে চাপ সৃষ্টি করেন, প্রতিবাদ করেন এবং সিদ্ধান্ত বদলানোর চেষ্টা করেন। যদি খেলোয়াড়রা রেফারিদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতেন, তাহলে সঠিক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনাও আরও বাড়ত। যদিও ফুটবলের বাস্তবতায় সেটি আপাতত অনেকটাই কল্পনার বিষয়।
সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক



