বিশ্বকাপ ফুটবলে রেফারিং বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মিসরের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি তুলেছে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তারা তদন্তের পাশাপাশি তাকে টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে। অন্যদিকে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে পুরো রেফারিং দল আর্জেন্টিনার হওয়ায় আলোচনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক প্রশ্ন: বিশ্বকাপে কোন ম্যাচে কোন রেফারিকে কীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়? সিদ্ধান্ত কে নেয়? কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়?
তিন বছরের বাছাই প্রক্রিয়া
বিশ্বকাপের জন্য রেফারি নির্বাচন শুরু হয় টুর্নামেন্টের অনেক আগে। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফিফা মোট ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি ও ৩০ জন ভিডিও ম্যাচ অফিশিয়াল (ভিএমও) নির্বাচন করেছে। ৬টি কনফেডারেশন ও ৫০টি সদস্যদেশের এসব কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত দলের নাম ‘ফিফা টিম ওয়ান’। গত ৯ এপ্রিল তালিকা প্রকাশের সময় ফিফা জানায়, তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা বিস্তৃত মূল্যায়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের বেছে নেওয়া হয়েছে।
ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত রেফারিরা এই সময়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে ছিলেন। বিভিন্ন সেমিনার, ফিফা টুর্নামেন্ট, আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় তাদের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফিফার রেফারিং পরিচালক মাসিমো বুসাক্কা জানান, ২০২২ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরপরই পরবর্তী আসরের রেফারি বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়। শুধু রেফারিং প্রশিক্ষক নন, ফিটনেস কোচ, চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টরাও এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শুধু রেফারিং দক্ষতা নয়, শারীরিক সক্ষমতা ও ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেও।
কোন ম্যাচে কে: সিদ্ধান্ত হয় কীভাবে
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকলেই যে একজন রেফারি সব ম্যাচ পরিচালনা করবেন, এমন নয়। প্রতিটি ম্যাচের আগে আলাদাভাবে রেফারিং দল নির্ধারণ করে ফিফার রেফারিং কমিটি। সিদ্ধান্তের সময় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা হয়।
একই দেশের রেফারি না রাখা
সবচেয়ে পরিচিত নিয়মটি হলো কোনো দেশের রেফারিকে সাধারণত সেই দেশের ম্যাচে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত এড়ানো। যেমন ফ্রান্স যদি সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ওঠে, তাহলে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের আর সেই ম্যাচে দায়িত্ব পাবেন না।
রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা বিবেচনা
শুধু নিজ দেশের ম্যাচই নয়, রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক কারণে সংবেদনশীল সম্পর্ক রয়েছে, এমন দেশগুলোর ম্যাচেও সংশ্লিষ্ট দেশের রেফারিদের সাধারণত রাখা হয় না। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ২০২২ বিশ্বকাপ। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনার ম্যাচে ইংলিশ রেফারি এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ এড়িয়ে চলে ফিফা। সেবার ইংলিশ রেফারি অ্যান্টনি টেইলরকে আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ফাইনালের জন্য বিবেচনা করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি পরিচালনা করেন পোল্যান্ডের সিমোন মার্সিনিয়াক। এবারও ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করছেন অ্যান্টনি টেইলর ও মাইকেল অলিভার। তাই ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার ম্যাচে তাদের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় বিবেচনা
নকআউট পর্ব যত এগোয়, ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব তত বেশি দেওয়া হয় ধারাবাহিকভাবে ভালো করা ও অভিজ্ঞ রেফারিদের। প্রতিটি ম্যাচের পর রেফারিদের পারফরম্যান্স নিয়ে বিশদ মূল্যায়ন করা হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভিএআরের সঙ্গে সমন্বয়, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ, এমনকি শারীরিক সক্ষমতাও সেই মূল্যায়নের অংশ। পরবর্তী ম্যাচের নিয়োগে এসব প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফিফা তাই শুধু আগের সুনাম নয়, চলতি টুর্নামেন্টে একজন রেফারি কেমন পারফর্ম করছেন, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। এ কারণেই গ্রুপ পর্বে দায়িত্ব পাওয়া কোনো রেফারি পরে আর ম্যাচ না-ও পেতে পারেন, আবার কেউ ধারাবাহিক ভালো করলে সেমিফাইনাল বা ফাইনালের মতো বড় ম্যাচও পরিচালনার সুযোগ পেয়ে যান।



