ঢাবি চারুকলায় পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রার প্রস্তুতি, রঙে রঙে মিশে বাংলার ইতিহাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পয়লা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। রংতুলির আঁচড়ে, কাগজ ও বাঁশ-কাঠের কাঠামোয় তৈরি হচ্ছে বাঘ, প্যাঁচা, পাখি থেকে শুরু করে নানা লোকজ মোটিফ। উৎসবের আমেজে সরগরম চারুকলা প্রাঙ্গণ। আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা কেউ মোটিফে শেষ রং দিচ্ছেন, কেউ আবার নতুন কাঠামো তৈরি করছেন। বাঘ, প্যাঁচা, চরকা ও নানা পাখির মোটিফে চলছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। এবারের আয়োজনের মূল দায়িত্বে আছে চারুকলার ৭১তম ব্যাচ। এবারের প্রতিপাদ্য—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
শোভাযাত্রার মূল কাঠামো ও প্রতীকী উপস্থাপনা
শোভাযাত্রার মূল কাঠামোর মধ্যে থাকছে চার চাকার কাঠের হাতি, কিশোরগঞ্জের টেপা পুতুল, শান্তির পায়রা, মোরগ ও দোতারা। এর পাশাপাশি থাকবে মাছ, বাঘ ও হরিণ শাবক, ছাগল ও ছাগশিশু, কাকাতুয়া, ময়ূর ও ঘোড়া। এ ছাড়া বিভিন্ন মুখোশের মধ্যে থাকবে রাজা-রানি মুখোশ, প্যাঁচা, বাঘ, সিংহ, খরগোশ প্রভৃতি। চারুকলার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিটি মোটিফের সঙ্গে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য মিশে আছে। রংতুলির আঁচড়ে তাঁরা সেই ইতিহাসকে তুলে ধরছেন। মূল কাঠামোর মধ্যে টেপা পুতুল কিশোরগঞ্জের সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেবে, মোরগের পেছনে সূর্যের কাঠামো দিয়ে গ্রামীণ সকালের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। শান্তির বার্তা দেবে পায়রা, আর লোকঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে থাকছে সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি। বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাউল ঐতিহ্য ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে থাকছে দোতারা।
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও উচ্ছ্বাস
ডিন অফিস চত্বরে টেপা পুতুলে পেপার পোস্টিংয়ের কাজ করছিলেন চারুকলার স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী সুমাইয়া তুষি। তিনি বলেন, আজকের মধ্যেই বৈশাখী শোভাযাত্রার বেশির ভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। তুষির ভাষায়, এই আয়োজন তাঁদের হাতে-কলমে শেখার বড় সুযোগ। সিনিয়র, শিক্ষক ও অ্যালামনাইদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। চারুকলার স্কুলঘরে বিভিন্ন মোটিফ বানানোর কাজ করছিলেন স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হুমায়রা খন্দকার। তিনি বলেন, বৈশাখের এই আয়োজন শিক্ষাজীবনের বাইরে সংস্কৃতিকে অনুভব করার সুযোগ এনে দেয়। গত বছর বৈশাখের আয়োজনে শিক্ষার্থীরা যুক্ত ছিল না। এ বছর আবার যুক্ত হতে পেরে খুব আনন্দ লাগছে।
ডিনের বক্তব্য ও শিল্পী সম্পৃক্ততা
চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে কথা হয় ডিন অধ্যাপক মো. আজহারুল ইসলাম শেখের সঙ্গে। তিনি শিক্ষার্থীদের কাজের তদারক করছিলেন। আয়োজন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের যে শিল্প ঐতিহ্য ও ইতিহাস আছে, বৈশাখী শোভাযাত্রায় সেটাকে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা চাই বিশ্ববাসী জানুক, আমাদের ঐতিহ্যের আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের শেকড় কতটা গভীর ও কালারফুল। প্রতিটি মোটিফ রঙিন। রঙিন করা হয়েছে নতুন বছরকে বরণ করার জন্য। নববর্ষকে উদ্যাপনের জন্য এই রঙের আয়োজন অনেক বেশি আকৃষ্ট করে, আনন্দের সঙ্গে যুক্ত থাকে।’ ডিন আরও জানিয়েছেন, এবারের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আছেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস, রনজিৎ দাস, শামসুজ্জোহা, রোকেয়া সুলতানা, ফরিদা জামান, শেখ আফজালসহ অনেক সনামধন্য শিল্পী। তাঁরা নিয়মিত আসছেন ও আয়োজনের খোঁজখবর রাখছেন।
পটচিত্রের মাধ্যমে ইতিহাস চিত্রণ
চারুকলা অনুষদের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের দেয়ালে চলছে শত বছরের পুরোনো লোকশিল্প পটচিত্রের কাজ। সেখানে কাপড়ের ওপর রং দিয়ে বিভিন্ন লোককথা, পৌরাণিক কাহিনি ও পৌরাণিক গল্প চিত্রিত করা হচ্ছে। চিত্রাঙ্কন করছিলেন পটুয়া নাজির হোসেন। তাঁর বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সভ্যতাকে তিনি তুলে ধরছেন রংতুলির আঁচড়ে। তাঁর পটচিত্রে স্থান পেয়েছে বেহুলা, গাজীরপট, পটচিত্র চম্পাবতী, পদ্মাবতী, বাঘের দেশে বৈশাখ, পটচিত্র আকবর, বনবিবি ইত্যাদি। পটুয়া নাজির হোসেন বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে কোনো না কোনোভাবে তিনি এই কাজে যুক্ত। এ পর্যন্ত এঁকেছেন ৩০ হাজার বাঘের ছবি। করেছেন ৬৩টি প্রদর্শনী। পটচিত্রের বিশেষত্ব তুলে নাজির হোসেন আরও বলেন, ‘পটচিত্রের মাধ্যমে বাংলার চার হাজার বছরের ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যেন মানুষ ইতিহাসকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে।’ বিলুপ্তপ্রায় এই পটুয়া শিল্পী নাজির হোসেন শিখেছেন তাঁর মায়ের কাছে। তিনি বলেন, ‘আমার মা নকশিকাঁথা করতেন। মায়ের কাছ থেকেই পটুয়াদের গল্প এবং নানা রকম লোকগল্পগুলো শুনতাম। সেই ভাবনা থেকে আঁকতে শুরু করি। আমার যতই কষ্ট হোক, আমার যতই দুঃখ হোক, দরকার পড়লে একবেলা কম খাব কিন্তু আমার সংস্কৃতি, আমার ঐতিহ্য—যেটাকে আমার বাংলা এবং আমার বাংলাদেশকে খুব সহজে বিশ্ববাসী খুঁজে পায়, সেই শিল্প আমি এঁকে যেতে চাই।’
দর্শনার্থীদের ভিড় ও উৎসবের আমেজ
বৈশাখ উদ্যাপনের পূর্বপ্রস্তুতি দেখতে চারুকলায় ভিড় করছেন নানা বয়সী দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার শিশুদের নিয়ে মোটিফ কিনে উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উত্তরা থেকে বড় বোন তানিশা সাজিমের সঙ্গে এসেছে প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া মিশান ইমরোজ। সে বলেছে, বাঘের মোটিফ দেখে একটু ভয় লেগেছে, তবে প্যাঁচা আর সিংহের মোটিফ পছন্দ হয়েছে। বাবা আনিস রায়হানের সঙ্গে রাজধানীর গোপীবাগ থেকে এসেছে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শঙ্খ সায়ন্তনী। চারুকলায় এসে নিজেও একটি ছবি এঁকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে, ‘আমার আঁকা ছবিটি সুন্দর হয়েছে। মুখের ছবিতে চুল, চোখ কান আছে। আর এখানে এসে ভালো লাগছে। শিল্পীদের চিত্রাঙ্কন অনেক সুন্দর।’ ডিন অফিস চত্বরে বৈশাখী শোভাযাত্রার জন্য তৈরি করে রাখা পালকির সামনে ছবি তুলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থী তাসমিয়া আদনিন ও উম্মে সালমা। তাঁরা দুজন বন্ধু। এই দুই সহপাঠী সামনাসামনি কখনো পালকি দেখেননি। ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পালকিকে বেশি পছন্দ করেছেন তাসমিয়া আদনিন। তিনি বলেন, ‘সরাসরি কখনো পালকি দেখা হয়নি। তাই বেশি ভালো লাগছে। ছোটবেলায় পালকির ছবি দেখতাম। মা ও দাদির কাছ থেকে অনেক গল্প শুনতাম।’ এবারও পয়লা বৈশাখের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে উৎসবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বানানোর বিপক্ষে তাসমিয়া আদনিন। তিনি বলেন, ‘নাম পরিবর্তন করা নিয়ে রাজনৈতিক মাতামাতির প্রয়োজন ছিল না। আমাদের কাছে উৎসবটা বেশি গুরুত্ব পায়, নাম নয়।’ এখনো চলছে নতুন কাঠামো তৈরির কাজ, যাতে পয়লা বৈশাখের দিন শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে আরও জমজমাট ও স্মরণীয়।



