বাবার স্মৃতি: বৃত্তি পরীক্ষার সেই দিন ও ক্যাসিও ঘড়ির উপহার
বাবার স্মৃতি: বৃত্তি পরীক্ষা ও ক্যাসিও ঘড়ির উপহার

আমার বাবা মিল্লাত হোসেন ভূঁইয়া পেশায় স্কুলশিক্ষক ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই গৃহশিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের পড়াতেন। এরপর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা এবং সর্বশেষ বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে থিতু হন। জীবনসংগ্রামের এক কঠিন চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। আমরা যখন বয়সে নবীন, তখনই তিনি আমাদের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে পরলোকে যাত্রা করেন।

শৈশবের স্মৃতি ও বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি

শৈশবের এক ধূসর অথচ উজ্জ্বল স্মৃতির পাতা ওল্টালে মনে পড়ে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার দিনগুলোর কথা। তখন আমাদের বাড়িজুড়ে ছিল পড়াশোনার তুমুল আবহ। খাওয়াদাওয়া ভুলে আমরা কেবল বইয়ের পাতায় মগ্ন থাকতাম। বড় ভাই শাকিল তখন মাধ্যমিকের ছাত্র। অথচ বাবার কঠোর অনুশাসনে আমার পরীক্ষার জন্য তাকেও পড়াশোনায় মগ্ন থাকতে হতো। পরিবারে একজনের পরীক্ষা মানে ছিল সবার সম্মিলিত সাধনা। যথারীতি পাতারহাটের এক কেন্দ্রে গিয়ে আমি বৃত্তি পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা কেমন হলো, সেই বয়সে তা অনুধাবন করার সাধ্য ছিল না।

ফলাফলের দিন ও উদ্বেগ

দিন গড়িয়ে যখন ফলাফলের সময় ঘনিয়ে এল, আমার বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। এক অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম—যদি বৃত্তি না পাই, তবে বাবার অবধারিত শাস্তির মাত্রা কেমন হবে, তা ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। দিনটি ছিল বৃত্তির ফলাফল প্রকাশের সন্ধ্যা। বাড়ির সবাই উদ্‌গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বাবা যখন বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন, আমি ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পড়ার টেবিলের নিচে লুকিয়ে গেলাম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৃত্তি প্রাপ্তি ও আনন্দ

কিন্তু পরক্ষণেই সায়েম চাচ্চুর হাতে বাবার আনা মিষ্টির প্যাকেট দেখে চারপাশের থমথমে পরিবেশ আনন্দে মুখর হয়ে উঠল। সবার সেই উল্লাস আর নাচানাচির কারণ প্রথমে ঠাওর করতে পারিনি। হতবিহ্বল হয়ে টেবিলের নিচ থেকে বেরিয়ে আসতেই শুনলাম, আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছি। সেই আনন্দের আতিশয্যে বাবা পরম স্নেহে আমার হাতে একটি চমৎকার ‘ক্যাসিও’ হাতঘড়ি উপহার হিসেবে পরিয়ে দিয়েছিলেন।

বাবার উপহারের স্মৃতি

জীবনের প্রথম সেই প্রাপ্তির আনন্দ ছিল অনির্বচনীয়। নিজ হাতে পাড়াময় মিষ্টি বিতরণ করেছিলাম। শৈশবের সেই ঘড়ি কালের নিয়মে আজ হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু বাবার সেই তৃপ্তিময় মুখের অবয়ব আর উপহারের স্মৃতি মন থেকে মুছে যাওয়ার নয়। বাবা আজ ইহলোকে নেই, কিন্তু পরপারে তিনি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করুন—এই আমার পরম চাওয়া।