কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের শিতলীরপাঠ গ্রামটি আশপাশের এলাকার তুলনায় কম তাপমাত্রার জন্য পরিচিত। সোমবার (১ জুন) দুপুরে চওড়া বাজারের চায়ের দোকানগুলো ফাঁকা হয়ে এসেছিল, রিকশাচালকরা গাছের ছায়ায় কপালের ঘাম মুছছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে শিতলীরপাঠ গ্রামে ঢুকতেই মনে হয় ঋতু বদলে গেছে। বাতাসে নেই ভ্যাপসা গরমের দমবন্ধ অনুভূতি, চারপাশে ঘন সবুজ, পাখির ডাক আর পুকুরঘেরা বসতি।
গ্রামের অবস্থান ও পরিবেশ
কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ছিনাই ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্রামটির অবস্থান। এক পাশে সিংগিমারী পাড়া, অন্য পাশে বানেশ্বর পাড়া। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় দেড় কিলোমিটারের এই গ্রামে আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, সুপারিবাগান, পুরোনো আমগাছ, লটকনের ঝোপ আর ঘন সবুজের ছাউনি চোখে পড়ে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশে ছোট-বড় পুকুর রয়েছে।
তাপমাত্রার পার্থক্য
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আশপাশের এলাকার তুলনায় এ গ্রামের তাপমাত্রা অন্তত দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ৩১ মে ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ১ জুন ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১ জুন দুপুরে মুঠোফোনের অ্যাপে জেলা শহরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি দেখা গেলেও শিতলীরপাঠ এলাকায় তা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বানেশ্বর পাড়ার কালীমন্দির এলাকার কৃষক বিষ্ণু চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, "এই গ্রাম ঠান্ডা-শীতল। অন্য এলাকায় কাজে গেলে তাপ বেশিই লাগে। শিতলীরপাঠ গ্রামে দুপুর কাজ করলেও শরীর ঘামে না। চারদিকে ছায়া, বাতাস ঠান্ডা। শরীরে ক্লান্তি কম লাগে।"
প্রকৃতি ও জীবিকা
শিতলীরপাঠ গ্রামের সবচেয়ে গরিব মানুষটির বাড়িতেও একটি ছোট সুপারিবাগান আছে। কারও এক শতকের ছোট জলাশয়, আবার কারও রয়েছে মাছের বড় ঘের। বাগানের সুপারি, পুকুরের মাছ শুধু খাবার নয়, অভাবের দিনে সংসারের ভরসা। গ্রামের গৃহবধূ বুলো রানী (৬০) বলেন, "এই গ্রামের সগারে (সবার) বাড়ি বাড়ি পুকুর আছে। আপনারা শহরের মানুষ মাছ কিনে ফ্রিজে রাখেন। আমরা পোনা মাছ পুকুরে ছাড়ি। দরকার হলে দুটা তুলে খাই, দুটা বেচে ছাওয়ার (সন্তানের) পড়ালেখার খরচ চালাই।"
সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাখির অভয়ারণ্য
বিকেলের দিকে গ্রামের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে শিতলীদেবীর মন্দিরসংলগ্ন এলাকা। বিশাল দুটি বটগাছের ছায়ায় বসেন গ্রামের প্রবীণেরা। পাশে কয়েকটি ছোট চায়ের দোকান, যার বেশির ভাগ পরিচালনা করেন নারীরা। শিশুদের জন্য রয়েছে 'মায়ের তরীর গুরুগৃহ' নামের সংগীত বিদ্যালয়, যেখানে শতাধিক শিশু গান শেখে। নরওয়ের কবি ও গবেষক ভেরা সেদার (৮০) এ গ্রামের পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেন।
শিতলীরপাঠ পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের কাছেও পরিচিত। সিঁদুরে মৌটুসী, লালঘাড় পেঙ্গা, গলাফোলা ছাতারে, ধূসর হাঁড়িচাচা ও বনসুন্দরীর মতো পাখির দেখা মেলে এখানে। 'ঢাকার পাখি: ছোট হয়ে আসছে আকাশ' প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা আসকার ইবনে ফিরোজ বলেন, "লালঘাড় পেঙ্গা সাধারণত শালবনে দেখা যায়, সেটিও এক-দুটি করে। কিন্তু শিতলীরপাঠে আমি একসঙ্গে ৮ থেকে ১০টি পাখি দেখেছি। সিঁদুরে মৌটুসীও সাধারণত পাহাড়ি বা টিলা অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। সমতলের একটি গ্রামে এদের উপস্থিতি সত্যিই বিস্ময়কর।"
পরিবেশবিদের মতামত
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, "একটি এলাকার তাপমাত্রা শুধু আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না, স্থানীয় পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিতলীরপাঠে বড় বড় গাছ, অসংখ্য পুকুর ও জলাভূমি রয়েছে। এগুলো তাপ শোষণ করে, বাতাসের আর্দ্রতা ধরে রাখে ও ছায়া তৈরি করে। এতে এখানে তুলনামূলক শীতল পরিবেশ গড়ে উঠেছে। তাপপ্রবাহের এ সময়ে শিতলীরপাঠ অন্য এলাকার জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে।"
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
তবে কুড়িগ্রাম জেলার সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় কুড়িগ্রামে তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়ছে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ছয় বছরে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু শিতলীরপাঠে এসে মনে হয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে তাপপ্রবাহের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।



