দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আগামী দুই বছর কঠিন সময় পার করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে দুই বছরের মধ্যে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
সোমবার (২২ জুন) রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘সংখ্যার বাইরে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়া: প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমি আগেভাগেই বলছি, আগামী দুই বছর কঠিন যাবে। এই সময়টা সবাইকে কিছুটা কষ্ট করতে হবে। জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে সরকার নীতিগত ও সামাজিক সহায়তা দেবে। কিন্তু ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীল অর্থনীতিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে।”
তিনি বলেন, “যদি বলি আগামীকাল সকালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তাহলে সেটা বাস্তবসম্মত হবে না। বর্তমান অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে কমপক্ষে দুই বছর প্রয়োজন। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের চিত্র দেখতে পাব।”
পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা
পুঁজিবাজার নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতেও প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। তবে এই খাতে বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমাদের প্রথম কাজ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।”
তিনি জানান, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্য, স্বাধীন ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আইন ও বিধিবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হচ্ছে— যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। জেপি মরগানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
সংস্কার ও ডিরেগুলেশন
অর্থনীতির সংস্কারের অংশ হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বলেন, “ডিরেগুলেশন বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়নে নানা বাধা আসবে, আমি তা জানি। কিন্তু দেশের স্বার্থে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও আমরা প্রস্তুত।”
তিনি আরও বলেন, “যারা সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করবে, তাদের জন্য সরকারের কোনও জায়গা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ নানা ধরনের জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন মানুষের জন্য একটি মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার সময় এসেছে।”
ডিজিটাল অর্থনীতি ও পেপ্যাল
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান পেপ্যালসহ কয়েকটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এর ফলে ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য বৈদেশিক আয় দেশে আনা সহজ হবে।
তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল অর্থনীতির সব ধরনের সুযোগ উন্মুক্ত করতে চাই। বৈদেশিক আয় দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে, এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সাড়া দিয়েছে।”
অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ ও অন্তর্ভুক্তি
অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে আমির খসরু বলেন, “শুধু প্রবৃদ্ধি বা রপ্তানির সংখ্যা দিয়ে অর্থনীতির সাফল্য বিচার করা যায় না। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও কল্যাণ নিশ্চিত না হলে সেই উন্নয়নের কোনও অর্থ নেই। তাই সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কুটির শিল্প, সৃজনশীল পেশাজীবী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও সমানভাবে সুযোগ পাবে।”
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, ট্রান্সকম লিমিটেডের সিইও সিমিন রহমানসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, “বাজেটের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত মানুষ। প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব বা বরাদ্দের হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব উদ্যোগ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা অবদান রাখছে।” তিনি বলেন, “অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শনই হওয়া উচিত বাজেটের মূল ভিত্তি।”



