শতবর্ষী গর্জনগাছ বাঁচিয়ে সড়ক নির্মাণ, বিরল দৃষ্টান্ত টেকনাফে
শতবর্ষী গর্জনগাছ বাঁচিয়ে সড়ক নির্মাণ টেকনাফে

সড়কের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া শতবর্ষী সাদা গর্জনগাছ। তাকে এড়িয়ে দুই পাশে বেঁকে গেছে পাকা রাস্তা। গাড়ি চলছে, মানুষও চলাচল করছে, কিন্তু কাটা পড়েনি সেই গাছ। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শিলখালী গর্জন বনের এই দৃশ্য এখন প্রকৃতি সংরক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সহাবস্থানের এক বিরল উদাহরণ।

গাছ বাঁচিয়ে সড়ক নির্মাণের গল্প

২০১৩ সালের দিকে টেকনাফের বাহারছড়া মেরিন ড্রাইভের অংশ থেকে বাহারছড়া ফরেস্ট অফিস পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মিটার (১ দশমিক ২ কিলোমিটার) সড়ক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। এ জন্য সংরক্ষিত বনের কয়েকটি গর্জনগাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এসব গাছ রক্ষায় স্থানীয় জনগণ জোট বাঁধেন, এগিয়ে আসে বন বিভাগও।

সে সময় টেকনাফ অঞ্চলে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। বর্তমানে তিনি সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, 'সড়ক নির্মাণের সময় কিছু গর্জনগাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল এলজিইডি। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, সড়কের মাঝখানে গাছ থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রেজাউল করিম বলেন, 'আমাদের অবস্থান ছিল—শতবর্ষী গর্জনগাছ কোনোভাবেই কাটা যাবে না। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও দাবি ছিল সড়ক হোক, কিন্তু গাছ কাটা যাবে না। শেষ পর্যন্ত গাছগুলো রেখেই সড়কটি নির্মাণ করা হয়। এখন এসব প্রাচীন গর্জনগাছ দেখতে নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন। এগুলো আমাদের অনন্য সম্পদ।'

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমিকা

বাহারছড়ার মিয়াপাড়া থেকে জাহাজপুরা এলাকায় এসব গাছ নিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, গাছগুলো টিকে আছে তিন প্রজন্ম বা তারও আগে থেকে। এসব গাছের কথা তাঁরা বাবা ও দাদার কাছে শুনেছেন। গাছ রক্ষার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের হাতে দিয়ে যেতে চান তাঁরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মিয়াপাড়ার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মো. জালাল প্রথম আলোকে বলেন, '২০১৩ সালের দিকে এসব গাছ কেটে ফেলতে চেয়েছিল এলজিইডি। বন বিভাগ ও আমরা মিলে বাধা দিয়েছি। এ সম্পদ কেউ তো তৈরি করতে পারব না, তাহলে কাটতে দেব কেন? এসব গাছের কথা আমি বাবা ও দাদার কাছ থেকে শুনেছি। তাই চাই, আমার পরের প্রজন্মও যেন এসব গাছ দেখে রাখে।'

জালালের দাবি, এলাকাটিতে ২৫০ বছর বয়সী গর্জনগাছও থাকতে পারে। এখনো মাঝেমধ্যে গভীর রাতে কাঠচোরেরা বনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। খবর পেলে গ্রামবাসী একসঙ্গে প্রতিরোধ করেন।

বন বিভাগের জরিপ

বন বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে কক্সবাজার জেলায় ৫ হাজার ৫২০টি মা গর্জনগাছ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০৬টি রয়েছে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ এলাকায়, যার বড় অংশের অবস্থান শিলখালী গর্জন বনে। আর এসব গর্জনগাছের মধ্যে সাদা গর্জনের আধিক্য বেশি দেখা গেছে।

গাছের শত্রু কাঠচোর

বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মাছ ধরার ট্রলার তৈরিতে গর্জন কাঠের চাহিদা বেশি। তাঁর সময়ে কাঠচোরেরা গভীর রাতে গাছের গোড়ায় ধীরে ধীরে কুঠার চালাতেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁরা এভাবে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলতেন। বন বিভাগ পড়ে যাওয়া এ ধরনের গাছ নিলামে তুললে কৌশলে তাঁরা নিলামে অংশ নিয়ে গাছগুলো কিনে নিতেন।

রেজাউল করিমের ভাষ্য, গর্জনগাছকে ৯ ফুট করে ৩ খণ্ডে কেটে ২৭ ফুটের পাটাতন তৈরি করে ট্রলার বানানো যায়। ট্রলার নির্মাণকারীদের কাছে তাই এ গাছের চাহিদা বেশি। এ কারণে ২০১৩ সালের পর বন বিভাগ পড়ে যাওয়া গর্জনগাছের নিলাম বন্ধ করে দেয়। এতে চোরদের উৎপাত কিছুটা কমে আসে।

সাদা গর্জনের আশ্রয়স্থল শিলখালী

শিলখালী গর্জন বন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল। বন বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে কক্সবাজার জেলায় ৫ হাজার ৫২০টি মা গর্জনগাছ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০৬টি রয়েছে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ এলাকায়, যার বড় অংশের অবস্থান শিলখালী গর্জন বনে। আর এসব গর্জনগাছের মধ্যে সাদা গর্জনের আধিক্য বেশি দেখা গেছে।

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে ৫০ কিলোমিটার পথ গেলে বাহারছড়া ইউনিয়নের মিয়াপাড়া। এখান থেকে জাহাজপুরা পর্যন্ত সড়কের কয়েকটি অংশে এখনো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকৃতির গর্জনগাছ। এসব গাছের বয়স ১০০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে।

অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন বলেন, শিলখালীর গর্জন বনটি প্রাকৃতিক ও প্ল্যান্টেশন (চারা রোপণ) দুটোই হতে পারে। সাদা গর্জন অনেক উঁচু হয়, এর শরীর মসৃণ এবং গায়ের রং হয় ছাই রঙের। মূলত কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে এ ধরনের গাছ বেশি হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ডিপটেরোকার্পাস।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের শিলখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বন রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে সহব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে বন পাহারা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এলজিইডির টেকনাফ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, 'সড়কটি হওয়ার কথা ছিল ১ দশমিক ২ কিলোমিটার। কিন্তু বন বিভাগের বাধার কারণে ৯০০ মিটার পর্যন্ত সড়ক করতে পেরেছি, বাকিটা করতে পারিনি। যতটুকু করেছি, গাছ বাঁচিয়ে করেছি।'

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, শিলখালীর গর্জনগাছগুলোর গড় বয়স ১৫০ বছরের বেশি। এর চেয়ে বেশি বয়সী গাছও থাকতে পারে। এগুলো ঐতিহ্যবাহী গাছ, যা স্থানীয় ইতিহাসকে ধারণ করে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

কামাল হোসাইন বলেন, 'গাছ বাঁচিয়ে সড়কটি হয়েছে, তবে সবচেয়ে ভালো হতো যদি বনের মধ্য দিয়ে সড়কটি না হয়ে বিকল্প কোনো পথে হতো। সদিচ্ছা আর জনসচেতনতা থাকলে গাছ রেখে যে সড়ক করা যায়, এটি তার উদাহরণ।'