যুক্তরাজ্যে বেতন স্থবিরতা: জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হতে লাগবে ১৩৭ বছর, বাংলাদেশেও একই চিত্র
যুক্তরাজ্যে বেতন স্থবিরতা: জীবনমান দ্বিগুণে ১৩৭ বছর

যুক্তরাজ্যে বেতন স্থবিরতা: জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হতে লাগবে ১৩৭ বছর

ফাইল ছবিসকাল থেকে সন্ধ্যা—হাড়ভাঙা খাটুনি, মাস শেষে বেতনও মিলছে। কিন্তু মাসের শেষের দিকে পকেটে টান। জীবনযাত্রার মান কি আগের চেয়ে বেড়েছে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন উন্নত বিশ্বের কর্মজীবীরা। যুক্তরাজ্যের নামী গবেষণা সংস্থা ‘রেজোল্যুশন ফাউন্ডেশন’ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলছে, বর্তমান গতিতে চললে দেশটির স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হতে সময় লাগবে প্রায় ১৩৭ বছর!

বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যবধান: একটি গভীর সংকট

মূলত দুই দশক ধরে চাকরির বাজারে বেতনের স্থবিরতা এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বেতন ও জীবনযাত্রার এই ব্যবধান না ঘুচলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রতিবছর চলতেই থাকবে। বেতন সীমিত কিন্তু খরচ লাগামহীন—প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৫ সাল পর্যন্ত চিত্রটি এমন হতাশাজনক ছিল না। তখন বার্ষিক গড় আয় বাড়ত ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। অর্থাৎ, মাত্র ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই একজন কর্মজীবীর জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু যুক্তরাজ্যে ২০০৫ সালের পর থেকে এই চাকা যেন থমকে গেছে। কর ও আবাসন খরচ মেটানোর পর কর্মজীবীদের হাতে থাকা প্রকৃত আয়ের প্রবৃদ্ধি এখন মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।

আনসাং ব্রিটেন: ১৩৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

এই মন্থরগতির কারণেই ১৩৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। একে তাঁরা বলছেন ‘আনসাং ব্রিটেন’। নব্বইয়ের দশকের চেয়ে এখনকার কর্মীরা অনেক বেশি খাটছেন, কিন্তু সেই বাড়তি পরিশ্রমের সুফল তাঁদের জীবনযাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাজ্যেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা দিচ্ছে, যেখানে কর্মজীবীরা ক্রমাগত সংগ্রাম করছেন।

বাংলাদেশেও কি একই প্রতিচ্ছবি?

ব্রিটেনের এই হাহাকার দূর প্রবাসের মনে হলেও আমাদের দেশের পটভূমিতে এটি ভীষণ চেনা। ঢাকার কারওয়ান বাজার কিংবা কোনো শিল্পাঞ্চলের কর্মজীবীর দিকে তাকালে একই চিত্র ফুটে ওঠে। যদিও উন্নত বিশ্বে এই সংকটের মূলে রয়েছে বেতনের স্থবিরতা, আমাদের এখানে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশেও এখন অনেক কর্মজীবী মানুষ ‘ওয়ার্কিং পুওর’ বা ‘কর্মজীবী দরিদ্র’ শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছেন। অর্থাৎ, ব্যক্তিটি বেকার নন, নিয়মিত চাকরি করছেন, কিন্তু তাঁর বেতন দিয়ে মাস শেষে মৌলিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ব্রিটেনের ১ কোটি ৩০ লাখ পরিবার যেভাবে আয় ও খরচের হিসাব মেলাতে না পেরে ‘রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার’ ঝুঁকি তৈরি করছে, আমাদের এখানকার শ্রমবাজারেও সেই চাপা অসন্তোষের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

চাকরি এখন দারিদ্র্যমুক্তির নিশ্চয়তা নয়

রেজোল্যুশন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী রুথ কার্টিস স্পষ্টভাবেই বলেন, একটি চাকরি থাকা মানেই যে মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে, সেই নিশ্চয়তা এখন আর নেই। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর ওপর করের বোঝা সচ্ছলদের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে আয়ের অনুপাতে স্থানীয় কর দেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্ররা ধনীদের চেয়ে চার গুণ বেশি চাপে থাকেন। এই চিত্র বাংলাদেশেও দেখা যায়, যেখানে পরোক্ষ করের বোঝা নিম্নবিত্তের ওপরই বেশি পড়ে এবং দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে তাঁদের সঞ্চয় শূন্যের কোটায় ঠেকে।

মুক্তির উপায় কী?

২০২৬ সালের এই উত্তাল শ্রমবাজারে কেবল একটি চাকরির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেতন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রকৃত আয়ের সুরক্ষা দিতে হলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয় করা জরুরি। কেবল কায়িক শ্রম নয়, বরং আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী হতে হবে, যাতে আয়ের বিকল্প পথ তৈরি হয়। দিন শেষে লন্ডন হোক বা ঢাকা, সারা বিশ্বের চাকরিজীবীদের লড়াইটা আজ একই সমতলে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৩৭ বছরের অপেক্ষা নয়। মানুষ তার কর্মক্ষম সময়ে সচ্ছলতা উপভোগ করতে চায়। তাই এখনই প্রয়োজন চাকরির বাজারে কার্যকর সংস্কার এবং ন্যায্য মজুরি কাঠামো।