সময়ের পরিক্রমায় আবারও আমাদের সামনে উপস্থিত হতে যাচ্ছে নতুন হিজরি বছর। হিজরি নববর্ষ কোনো আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, তওবা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। হিজরি সনের সূচনা জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মহান ঘটনা— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের সঙ্গে। এই হিজরত শুধু স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি ত্যাগ, ধৈর্য, সংগ্রাম, ইমান ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার এক অনন্য শিক্ষা।
মহররম— আল্লাহর সম্মানিত মাস
মহান আল্লাহ তাআলা কিছু মাসকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। মহররম সেই চারটি সম্মানিত মাসের (আশহুরে হুরুম) অন্যতম। কুরআনে বলা হয়েছে: 'নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি... এর মধ্যে চারটি সম্মানিত। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম কর না।' (সুরা তাওবাহ: আয়াত ৩৬) তাফসিরবিদ ও ফকিহগণ একমত যে, এই চারটি সম্মানিত মাস হলো— জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। সম্মানিত মাস হওয়ার অর্থ হলো, এ সময়ে নেক আমলের সওয়াব যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি গুনাহের ভয়াবহতাও বৃদ্ধি পায়। তাই এ মাসে পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং বেশি বেশি ইবাদতে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
'আল্লাহর মাস' মহররম
মহররমের মর্যাদা এতটাই মহান যে রাসুলুল্লাহ (সা.) একে 'আল্লাহর মাস' বলে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে এসেছে: 'রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।' (মুসলিম) প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে রজব আল-হাম্বলি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা তার বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের প্রমাণ বহন করে।
আশুরা— মহররমের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিন
মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম বা আশুরা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। কারণ এদিন আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও তার কওমকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) বলেন: 'মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।' (বুখারি) এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে তিনি বলেন: 'আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজার মাধ্যমে তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।' (মুসলিম) ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়াতে ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা উত্তম।
হিজরি নববর্ষে একজন মুসলমানের করণীয়
- খাঁটি তওবা করা: নতুন বছরের শুরুতে অতীতের গুনাহ ও ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
- আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি: গত বছরের আমল পর্যালোচনা করে নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সেগুলো সংশোধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
- নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার দৃঢ় সংকল্প নিতে হবে।
- কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা: প্রতিদিন নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা এবং সে অনুযায়ী জীবন গঠন করা জরুরি।
- নফল রোজা ও ইবাদত বৃদ্ধি করা: বিশেষত মহররমের রোজা, জিকির, দোয়া ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
- দান-সদকা ও মানবসেবা: অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দান-সদকা করা এবং মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা উচিত।
- আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা: পিতা-মাতার সেবা, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
মনগড়া আমল থেকে সতর্কতা
হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে সমাজে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ দোয়া, নির্দিষ্ট নামাজ বা উৎসবমুখর আয়োজন প্রচলিত থাকলেও এসবের অনেকগুলোর কোনো সহিহ ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে পাওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু সংযোজন করবে, যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।' (বুখারি, মুসলিম) তাই সকল ইবাদত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী।
হিজরি নববর্ষ একজন মুমিনের জন্য আনন্দ-উৎসবের নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা এবং নতুনভাবে আল্লাহর পথে চলার অঙ্গীকার করার সময়। মহররম মাসের ফজিলত ও আশুরার গুরুত্ব উপলব্ধি করে যদি আমরা নিজেদের জীবনকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সাজাতে পারি, তাহলে নতুন বছর আমাদের জন্য কল্যাণ, বরকত ও নাজাতের বছর হয়ে উঠবে। আসুন, নতুন হিজরি বছরকে স্বাগত জানাই গুনাহমুক্ত জীবন, বেশি বেশি ইবাদত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দৃঢ় প্রত্যয়ে। আল্লাহ তাআলা আমাদের কবুল করুন। আমিন।



