নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: একটি জটিল বাস্তবতা
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আমাদের সমাজে সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা ও আহাজারির পাশাপাশি বিরাজ করে এক গভীর বিবমিষা। বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিয়ত ও উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন, যা প্রকাশ পায় তাদের ভাষণ, বিবৃতি ও ঘোষণাপত্রে। 'নারী' বিষয়ে নারীরা যতটা ভাবেন, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা তার চেয়েও বেশি ভাবতে দেখা যায়। নারী কীভাবে সাজবেন, চলবেন, বলবেন বা ভাববেন—এসব চিন্তায় অনেক পুরুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি প্রশ্ন হলো, সমাজের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?
রাজনীতিতে নারীর অবস্থান: চ্যালেঞ্জ ও দ্বন্দ্ব
একদল মানুষ মনে করে, নারী নেতৃত্ব কাম্য নয়। যারা এই বিশ্বাস ধারণ করেন, তাদের সঙ্গে তর্ক করা কঠিন। তবে যারা কথায় ও লেখায় নারীর অংশগ্রহণের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন, তারা আদৌ এটা বিশ্বাস করেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম, যার পেছনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ বিদ্যমান। রাজনীতির মাঠের পরিবেশ নারীবান্ধব নয় বলেই ধরা হয়। অবশ্য রাজনীতি সমাজের বাইরের কোনো বিষয় নয়। আমাদের সমাজ নারীকে যে চোখে দেখে, রাজনীতির অঙ্গনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন, দুই নারী ৪৫ বছর ধরে দেশের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সরকারপ্রধান হিসেবে ৩৫ বছর দেশ পরিচালনা করেছেন। তাহলে কীভাবে বলা যায় যে দেশে নারী নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হয়নি? এটি একটি যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন বটে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা দুজন ব্যক্তি মাত্র। একটি শূন্যতার মধ্যে পারিবারিক উত্তরাধিকারের সূত্রে তারা রাজনীতিতে এসেছিলেন এবং পরে নিজ গুণেই নেতা হয়েছিলেন। কিন্তু এটি একটি সাধারণ নিয়ম হতে পারে না।
সংবিধান ও আইনের দ্বন্দ্ব
রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব দীর্ঘদিন টিকে থাকার পরও নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কি ইতিবাচক হয়েছে? হয়তো কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে উল্টোযাত্রাও লক্ষ্য করা যায়। আমাদের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা বলা আছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় আইনের অনেক বিধানও চালু রয়েছে, ফলে একটি ভজকট অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ–সংক্রান্ত 'সিডও' সনদ গ্রহণ করেছে শর্ত সাপেক্ষে, কিন্তু সনদের কয়েকটি ধারা এখনো গ্রহণ করেনি। এ ব্যাপারে মূলধারার বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা রয়েছে, যারা সরকারে গিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করেছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার 'রাষ্ট্র সংস্কারের' লক্ষ্যে কয়েকটি কমিশন গঠন করেছিল, যার মধ্যে একটি ছিল নারীবিষয়ক কমিশন। এই কমিশন কঠোর পরিশ্রম করে একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও, এ নিয়ে ব্যাপক হইচই সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল এই প্রতিবেদনের পক্ষে দাঁড়ানোর সৎসাহস দেখাতে পারেনি, ফলে কমিশনের প্রতিবেদন আঁতুড়েই মারা যায়। ইউনূস সরকার ছয়টি কমিশনের সমন্বয়ে একটি কমিটি করেছিল, কিন্তু তাতে নারীবিষয়ক কমিশনের জায়গা হয়নি। পুরো ঘটনাটি ছিল এক নিদারুণ অপচয় ও হতাশার।
সংরক্ষিত আসন: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সংকট
বাংলাদেশের আইনসভায় নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে, যা শুরু থেকেই চলে আসছে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতেন, তখন আসনসংখ্যা ছিল ৭টি। ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানের জারি করা আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে, যেখানে জাতীয় পরিষদে নারীর জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। এই ১৫ জনকে ভাগ করে নেবে সাধারণ নির্বাচনে জিতে আসা দলগুলো।
অনেকেই মনে করেন, আমাদের বাহাত্তরের সংবিধান বিশ্বসেরা। তবে উল্লেখ্য, ওই সংবিধানে নারীর জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। নতুন দেশে মানুষ গণতন্ত্রের জন্য এবং বৈষম্য দূর করতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অনেক আন্দোলন করেছে। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে দেখা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ভোটের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ইয়াহিয়ার আইনি কাঠামোকেই অনুসরণ করা হয়েছে, যেখানে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা সব কটি আসন নিয়ে নেবে। এ রকম একটি অগণতান্ত্রিক ও পশ্চাৎপদ ব্যবস্থা সংবিধানে রেখে দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকার সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়েছে, কিন্তু পুরোনো 'নির্বাচন' প্রক্রিয়াটিই অক্ষুণ্ন রেখেছে। তবে একটু পরিবর্তন হয়েছে: সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো তাদের আসনসংখ্যা অনুযায়ী নারীদের কোটা করে নেয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন দিলে সমস্যা কোথায়? ১৯৫৪ সালে এ ব্যবস্থা থাকতে পারলে ২০২৬ সালে এসে এটা কেন থাকবে না?
স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদের পার্থক্য
স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত নারী আসনে ভোট হয়। সেখানে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাই তাঁদের ভোট দেন এবং আলাদা ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হয়। তাহলে জাতীয় সংসদের বেলায় অন্য রকম ব্যবস্থা কেন? নাকি স্থানীয় পর্যায়ে নারীরা অনেক বেশি স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও পরিপক্ব! আর জাতীয় পর্যায়ে নারীরা নবিশ ও অবলা! আমাদের দেশে তথাকথিত অনেক নারী নেতা এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখা অনেক নারীকে দেখেছি, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হতে মুখিয়ে থাকেন।
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এযাবৎ যত নারী সংরক্ষিত আসনে পুরুষনির্ভর রাজনৈতিক দলের বদান্যতায় সংসদে গেছেন, তাঁদের কয়জন কী অবদান রেখেছেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সদস্যকে দেখেছি, তাঁরা ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না, এমনকি স্ক্রিপ্ট দেখেও কথা বলতে পারেন না। অথচ তাঁদের আমরা বেতন-ভাতা দিয়ে পুষছি! প্রশ্ন উঠতে পারে, সাধারণ নির্বাচনে জিতে আসা সদস্যদের গুণমান কি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের চেয়েও বেশি?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নারীর জন্য বরাদ্দকৃত ৫০টি আসন শিগগিরই ভাগাভাগি হবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে। গণমাধ্যমে দেখা গেছে, একটি বড় দল মনোনয়নপত্র বিক্রি করছে এবং মনোনয়ন পেতে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। প্রথম দিনেই মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাঁদের অনেকেই সাংবাদিকদের বলছেন, তাঁরা নাকি অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, অতএব একটি আসন তাঁদের প্রাপ্য। তাঁদের অভিযোগ, অনেকেই উড়ে এসে জুড়ে বসতে চাইছেন।
এই ডামাডোলের মধ্যে যে ভাবনাটি কেউ সামনে আনছেন না, তা হলো নাগরিকদের মুখোমুখি না হয়ে সরাসরি নির্বাচন এড়িয়ে দলীয় নেতার বদান্যতায় সংরক্ষিত নারী আসনে যাঁরা মনোনীত হবেন, তাঁরা রাজনীতির মাঠে থেকে যাবেন 'অবলা' হিসেবেই। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।



