বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই দেশজুড়ে ভ্যাপসা গরমের আঁচ অনুভব করছে মানুষ। ঢাকাসহ সারাদেশে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে, যা কাঠফাটা গরমের সৃষ্টি করেছে। এই প্রচণ্ড তাপমাত্রার মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও আবহাওয়ার ওপর আমাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং উপযুক্ত জীবনযাপনের মাধ্যমে আমরা এই গরমে সুস্থ ও নিরোগ থাকতে পারি। একটু সচেতনতা এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপই পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করতে।
গরমে সুস্থ থাকার মূল নীতিমালা
প্রচণ্ড গরমে শরীর সুস্থ রাখার জন্য দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা এবং পুষ্টিকর ও সুষম খাবারের সঠিক সমন্বয় বজায় রাখা। এই তীব্র তাপমাত্রার সময়ে শুধু উপযুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং কিছু নির্দিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলাও সমানভাবে জরুরি। একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে আমাদের জানতে হবে কী খাবেন এবং কী খাবেন না।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
গরমের সময়ে স্বস্তি পেতে এবং শরীর সুস্থ রাখতে নিম্নলিখিত খাবারগুলো খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত:
- অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত, কোমল পানীয় এবং বাজারের প্যাকেটজাত শরবত
- চা, কফি এবং অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়
- অতিরিক্ত তেলে ভাজা পোড়া খাবার
- মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার
- তেল ও মসলাযুক্ত গুরুপাক খাবার
- গরু ও খাসির মাংসের ভারী পদ
- প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং ফাস্টফুড
এই অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো যতই মুখরোচক হোক না কেন, সুস্থ থাকতে চাইলে এগুলো পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কেন এই খাবারগুলো বাদ দেবেন?
গরমের দিনে আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই পানির ঘাটতি দেখা দেয়। এই অবস্থায় অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত পান করলে চিনি কোষের পানি শুষে নেয়, ফলে শরীর আরও বেশি পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এর ফলে অবসাদ, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং তীব্র মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ওজনাধিক্যে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য চিনিযুক্ত পানীয় ওজন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার খেলে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা এসিডিটি, পেটে গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং আলসারের কারণ হতে পারে। তাই এই ভ্যাপসা গরমে সারা দিন সুস্থ থাকতে চাইলে তেলে ভাজা ও মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
গরমে কী খাবেন?
তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে সঠিক খাবার নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত পরিমাণে সুষম খাবার গ্রহণ করলে সারাদিন সুস্থভাবে জীবনযাপন করা সহজ হয়। গরমের সময়ে খাদ্যতালিকা হতে হবে সহজ, সুপাচ্য এবং সহজে হজমযোগ্য। পর্যাপ্ত ক্যালরিসমৃদ্ধ সুষম খাবারের সমন্বয় থাকা আবশ্যক।
সুষম খাদ্যতালিকার উপাদান
খাদ্যতালিকায় নিম্নলিখিত গ্রুপের খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত:
- প্রোটিন
- শর্করা
- ফ্যাট
- ভিটামিন ও মিনারেলযুক্ত খাবার
- পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবারজাতীয় খাবার
লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি খাওয়া ভালো, কারণ এগুলোতে ক্যালোরি কম কিন্তু ডায়েটারি ফাইবার বেশি থাকে। এই ফাইবার পেটে অনেকক্ষণ থাকে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।
প্রোটিনের উৎস
এই গরমে অতিরিক্ত প্রথম শ্রেণির প্রোটিন গ্রহণ না করাই ভালো। গরু বা খাসির মাংসের পরিবর্তে মাছের ঝোল খাদ্যতালিকায় রাখুন। দুধের বদলে টক দইয়ের শরবত বা মাঠা পান করতে পারেন। দই একটি উৎকৃষ্ট প্রোবায়োটিক, যা খারাপ ব্যাকটেরিয়া দূর করে ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে, হজমে সহায়তা করে এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্বাস্থ্য বজায় রাখে।
গরমের দিনে চিড়া-দই-কলা বা দুধ-চিড়া-কলা খাওয়া যেতে পারে। এই খাবারগুলো পেট ঠান্ডা রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।
তরল ও ফলজাতীয় খাবার
এই সময়ে ডাবের পানি, তরমুজ, বাঙ্গি, তালের শাঁস, বেলের শরবত, তাজা ফলের জুস, লেবুর শরবত এবং খাবার স্যালাইন পান করা উপকারী। এই পানীয়গুলো শরীরের পানির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
জীবনযাপনে আনুন পরিবর্তন
খাবারের পাশাপাশি জীবনযাপনের ধারায়ও কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। তীব্র রোদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কাজ না থাকলে ঘরে থাকাই ভালো। সম্ভব হলে ভরদুপুরে বাইরে না বের হয়ে বিকাল বা সন্ধ্যায় বের হওয়ার চেষ্টা করুন।
তীব্র রোদে বের হতে হলে তিনটি জিনিস সঙ্গে নিতে ভুলবেন না: ছাতা, রোদচশমা এবং বিশুদ্ধ পানির বোতল। এই সতর্কতা আপনাকে হিট স্ট্রোক থেকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক: পুষ্টিবিদ, উত্তরা ক্রিসেন্ট হসপিটাল, ঢাকা



