পহেলা বৈশাখে ইলিশের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি: জাটকা নিধন ও উৎপাদন সংকটের প্রভাব
পহেলা বৈশাখে ইলিশের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি: জাটকা নিধন

পহেলা বৈশাখে ইলিশের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি: জাটকা নিধন ও উৎপাদন সংকটের প্রভাব

যদিও পহেলা বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের কোনও সরাসরি ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই, তবুও এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এর চাহিদা তীব্রভাবে বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে একদল অসাধু চক্র নির্বিচারে জাটকা নিধনে মেতে ওঠে। গবেষকদের মতে, দেশে বছরজুড়ে মোট যত জাটকা ধরা হয়, তার অন্তত ৬৫ শতাংশ নিধন হয় কেবল মার্চ ও এপ্রিল মাসে— যার মূল লক্ষ্য বৈশাখের বাজার।

বাজারে উত্তাপ: ইলিশের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে

বাজার ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম এখন আকাশচুম্বী। বৈশাখকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে আকারভেদে কেজিতে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বর্তমানে ৪০০-৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকায়। আর এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম পড়ছে ২৬০০ থেকে ২৮০০ টাকা, যা সুযোগ বুঝে অনেক সময় ৩২০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকছেন বিক্রেতারা।

রাজধানীর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “যদিও বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের কোনও সম্পর্ক নাই। তার পরেও আজ তা কালচারে পরিণত হয়েছে। সন্তানদের আবদার মেটাতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এখন জাটকা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা ও বিপন্ন অভয়াশ্রম

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞায় ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ে এবং ৪৪ দশমিক ২৫ হাজার কোটি জাটকা উৎপন্ন হয়। তবে ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশের প্রত্যাশিত উৎপাদন বাড়েনি। বরং জুলাই-আগস্ট সময়ে ইলিশ আহরণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সার্বিকভাবে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ সময়কালের মধ্যে ইলিশ আহরণ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যদিও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এআরআইএমএ মডেল অনুযায়ী, উৎপাদন ৫ দশমিক ৩৮ থেকে ৫ দশমিক ৪৫ লাখ মেট্রিক টন হয়েছে। নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, বাস্তব উৎপাদন আরও কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করেন গবেষকরা।

ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট সংকটের কারণে এই ধরনের নেতিবাচক ফল তৈরি হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ইলিশের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের বিচরণও সীমিত হয়ে পড়েছে। মেঘনার মোহনায় ডুবোচরের সংখ্যা বাড়ায় ইলিশের চলাচলের প্রধান পথগুলো সংকুচিত হচ্ছে। এছাড়া নদী ও উপকূলীয় দূষণ, অনিরাপদ অভয়াশ্রম এবং অতিরিক্ত আহরণও ইলিশ বিপর্যয়ের বড় কারণ। বিশেষত শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকের কণা ইলিশের আবাসস্থল এবং খাদ্যশৃঙ্খল হুমকির মুখে ফেলেছে বলেও মনে করেন তারা। সব মিলিয়ে ইলিশের গতিপথ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।

রফতানি পরিস্থিতি ও সরকারি পদক্ষেপ

২০২৫ সালে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিলেও বর্তমান তারেক রহমানের সরকার এই বছর এখনও পর্যন্ত ইলিশ রফতানির কোনও অনুমতি দেয়নি।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আরাফাত আলীর মতে, বাজারে বড় ইলিশের তুলনায় জাটকাই বেশি। সরকারের চোখ ফাকি দিয়ে নদী ও সাগরে প্রতি বছর শত শত টন জাটকা শিকার করা হচ্ছে। সরকারের তদারকি বাড়লে এই জাটকাকে আগামীদিনের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।

মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ-মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, দেশে ১৯৮০ সালের আগে প্রচুর ইলিশ উৎপাদন হতো। কিন্তু মাঝখানে ইলিশ উৎপাদনে ভাটা পড়ে। সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বর্তমানে ৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে এই উৎপাদন ২০ লাখ মেট্রিক টনে নেওয়া সম্ভব। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে সাগর থেকে বাজার পর্যন্ত নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।

একনজরে দেশের ইলিশ উৎপাদন: অতীত ও বর্তমান

বাংলাদেশের নদ-নদীতে একসময় ইলিশের যে প্রাচুর্য ছিল, তা আজ ঐতিহ্যের অংশ। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে দেশের প্রায় ১০০টি নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত এবং বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী তিন দশকে পরিবেশ বিপর্যয় ও অপরিকল্পিত আহরণে এই চিত্র বদলে যায়।

২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন সর্বনিম্ন ২ লাখ মেট্রিক টনে নেমে আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরে উৎপাদনের কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে অনলাইনে কম দামে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সাধারণ ক্রেতাদের সস্তায় ইলিশ কেনার প্রলোভনে পা না দিতে পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাটকা আহরণ বন্ধ করা ও অভয়াশ্রমগুলোতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করা গেলে বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন ইলিশ ব্যবসায়ীরা।