ছেলেটার বাবাকে নিয়ে বলার মতো খুব বেশি গল্প নেই। ছোটোবেলার স্মৃতিতে বাবার আঙুল ধরে হাঁটার দৃশ্য নেই, নেই কাঁধে চড়ে গ্রামের বাজারে ঘুরে বেড়ানোর কোনো ছবি। হাওয়াই মিঠাই বা রসগোল্লার স্বাদও বাবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়নি কখনো। কারণ স্মৃতি জমার আগেই বাবা চলে গিয়েছিলেন—নীরবে, নিঃশব্দে; ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেন স্মৃতির ভেতরে নিজের নাম খোদাই করে যাওয়ার সময়টুকুও পাননি! অথচ যাকে সে কখনো ঠিকভাবে কাছে পায়নি, তিনিই তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ছায়া হয়ে নীরবে রয়ে গেছেন!
অনুপস্থিতির ছায়া
কিন্তু এ ছায়া দৃশ্যমান আলোয় জন্ম নেয় না—এ জন্ম নেয় অনুপস্থিতির ভেতর থেকে। এমন এক আলোয়, যা দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়; যেখানে হারিয়ে যাওয়াই এক ধরনের স্থায়ী উপস্থিতি হয়ে দাঁড়ায়।
মা প্রায়ই বলেন, ছেলেটা পুরো বাবার মতো হয়েছে। শুধু গায়ের রংটা একটু চাপা। বাবা ছিল আরও ফর্সা। ছেলেটা এসব শুনে শুধু মুচকি হাসে। অদ্ভুতভাবে সেই হাসিতেও নাকি বাবার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়! যারা একবারের জন্য হলেও তার বাবাকে দেখেছেন, তারা তাকে দেখেই বলে দেয়—এ তো অমুকের ছেলে! এইভাবে তার পরিচয় যেন আগেই তৈরি হয়ে গেছে। নিজেকে বোঝাতে কখনো খুব বেশি শব্দ খরচ করতে হয় না। বাবা সব সহজ করে রেখে গেছেন।
ছেলেবেলা থেকে সে শুধু একটি কথাই শুনে বড়ো হয়েছে—তাকে বাবার মতো হতে হবে। বাবা যেন তার জীবনের অদৃশ্য মানদণ্ড, এক অদৃশ্য কাঠামো, যার বাইরে গেলে সে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে! অথচ পৃথিবীতে কেউ কারও মতো হয় না, এটা সে জানত। তবুও বাবার সেই ছায়া থেকে বের হতে পারেনি কখনো।
ড্রইংরুমের ছবি
বাসার ড্রইংরুমে একসময় বাবার আবক্ষ একটা ছবি ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট কাকু বড়ো করে প্রিন্ট করে ফ্রেমে বাঁধাই করে দিয়েছিলেন। ছবিটা ছিল নীরব, স্থির, কিন্তু দেয়ালে তার অস্তিত্ব ছড়িয়ে থাকত। মা মাঝেমধ্যে সেই ছবিটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতেন। কেন রাখতেন, ছেলেটা কখনো জানতে চায়নি। কিছু অভিমান শব্দের চেয়েও বেশি ভারী হয়। হয়ত বাবার ওপর তীব্র অভিমানে চোখে চোখ রাখতে চাইতেন না!
একদিন সে ভেবেছিল, ছবিতে বাবার যে বয়স সে বয়সে নিজের একটি ছবি তুলে একই রকমভাবে ফ্রেমবন্দি করে পাশে রাখবে। অতীত আর বর্তমান পাশাপাশি থাকবে। কিন্তু সময় তার সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে সে দেখে, ছবিটি আর সেখানে নেই। বুয়াকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, মা সরিয়ে দিয়েছেন। সে আর কিছু বলে না। মাকে জিজ্ঞেস করার সাহসও হয় না। বাবার জন্য মায়ের কান্না দেখে দেখে বড়ো হয়েছে। মায়ের কান্নার কোনও ‘কারণ’ তৈরি করতে চায় না সে। তাছাড়া তার বয়সও বাবার ছবির বয়সকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে!
খেলাপাগল বাবার উত্তরাধিকার
ছেলেটার বাবা ছিলেন খেলাপাগল মানুষ। দেড় কিলোমিটার হেঁটে গ্রামের বাজারে গিয়ে একমাত্র ব্যাটারিচালিত সাদা-কালো টেলিভিশনে খেলা দেখতেন। বাবার তিন ব্যাটারির একটা রেডিয়ো ছিল। তাতে খেলার ধারাবিবরণী শুনতেন। বাবাকে সঙ্গ দিতে আশপাশের মানুষ তাদের বাড়িতে জড়ো হতো। ঘর ভরে যেত শব্দে, উত্তেজনায়, মানুষের ভিড়ে। একবার গল্প জুড়লে তার সময়ের জ্ঞান থাকত না।
ছেলেটার কাছে তখন এসব ছিল কেবল অপ্রয়োজনীয় কোলাহল। সে ভাবত—একটা মানুষ কীভাবে এতটা ডুবে যেতে পারে একটা খেলার ভেতর? কিন্তু সময় তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাকে বদলে দিতে শুরু করে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেও খেলা দেখতে শুরু করে। বড়ো কোনো ম্যাচ এলে বন্ধুদের ডেকে আনে। একসাথে বসে খেলা দেখে, তর্ক করে, সময় ভুলে যায়।
এ সময় দূর থেকে মা তাকিয়ে থাকেন। তার চোখ ভেজা থাকে। ছেলেটা বেশ বুঝতে পারে, সেই চোখের অর্থ কী। সে আরও বুঝতে পারে, ক্রমশ সে বাবার দিকে হাঁটছে—যেন কেউ পেছন থেকে তাকে একই পথে ঠেলে দিচ্ছে!
শিক্ষক বাবার ছায়ায়
ছেলেটা কখনোই তার বাবার মতো পুরোদস্তুর ‘শিক্ষক’ হতে চায়নি। বাবার জীবন ছিল টানাপোড়েন আর ক্লান্তিময়। তার বেতন ছিল সামান্য, তাও নিয়মিত পেতেন না। সকাল-বিকাল টিউশন করে টাকা উপার্জন করতে হতো। না হলে সংসারের চাকা থেমে যেত। এই চাকা সচল রাখতে গিয়ে তাদেরকে ঠিকমতো সময় দিতে পারতেন না। তবে শিক্ষক হিসাবে তার যশ ছিল। গণিতে তুখোড় ছিলেন। কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান পেতে তার বাবাই ছিলেন অনেকের প্রধান ও একমাত্র ভরসা। ছেলেটাকে এখনও অনেকে ‘স্যারের ছেলে’ বলে সম্বোধন করে। তার মিশ্র অনুভূতি হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার সময় সহপাঠীদের কাছে এটা-সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথম বুঝতে পারে—বাবার মতো সেও সহজ করে বোঝাতে পারে। কঠিন বিষয়কে সহজ করার ভেতরেই সে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পায়। একদিন এক সহপাঠী বলেই বসে, তুমি শিক্ষক হলে খুব ভালো করতে! এত সহজ করে বোঝানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। সেই মুহূর্তে তার মনে হয়, কোথাও যেন একজন অদৃশ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে।
অতঃপর গল্পটা যখন ঘুরে ঘুরে নিজেরই ভেতর এসে একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে, তখন সে হঠাৎ বুঝতে পারে—সে নিজেই এ গল্পের ধারাবাহিকতা। সময় আসলে কোথাও থামে না, ভাঙেও না। নদীর মতো এক প্রজন্মের ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে আরেক প্রজন্মে মিশে যায়। শুধু মানুষ বদলায়, মুখ বদলায়, সম্বোধন বদলায়। যে একদিন কারও সন্তান ছিল, সে-ই একসময় কারও ‘বাবা’ হয়ে ওঠে। যে হাত একদিন বাবার স্পর্শ খুঁজে ফিরেছে, সেই হাতই একদিন সন্তানের মাথায় আশ্রয় হয়ে নেমে আসে।
নিজের সন্তানের চোখে বাবা
সময়ের নিয়ম মেনে একদিন সে নিজেও বাবা হয়। সন্ধ্যার ম্লান আলো ধীরে ধীরে ঘরে নেমে আসে। জানালার ফাঁক গলে আসা শেষ রোদের রেখা দেয়ালের ওপর দুটো ছায়া এঁকে দেয়—একটি বড়ো, আরেকটি ছোট। সে সন্তানের কাছে গিয়ে বসে। মাথায় আলতো করে হাত রাখে। ছোট্ট শরীরের উষ্ণতা তার হাতের তালু ছুঁয়ে যায়। মুহূর্তেই তার মনে হয়, বহু বছর আগে কোনো এক সন্ধ্যায় হয়ত তার বাবাও ঠিক এভাবেই তার দিকে তাকিয়েছিলেন, তার মাথায় হাত রেখেছিলেন। হয়ত তিনিও অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলেন, তার মতো করে। যে কথার শরীর শব্দ দিয়ে তৈরি নয়। নৈঃশব্দই যার ভাষা।
ঘরের ভেতর গভীর নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও যেন সে বহু দূর থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পায়। মনে হয়, অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ একই ঘরে এসে পাশাপাশি বসেছে। দেয়ালে তার ছায়া, তার সন্তানের ছায়া—আর তাদের মাঝখানে অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ছায়া। তার বাবার। তার মনে হয়, সময় আবারও সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে এসেছে। শুধু দৃশ্যপট বদলেছে। একদিন সে ছিল সন্তানের জায়গায়, আজ সে বাবার জায়গায়। কাল হয়ত তার সন্তানও দাঁড়াবে এই একই বৃত্তের অন্য প্রান্তে।
সে বুঝতে পারে, এই গল্পের শুরু কিংবা শেষ কোনোটাই তার হাতে নেই। তার বাবা, সে এবং তার সন্তান—তারা প্রত্যেকেই একটি দীর্ঘ গল্পের পৃথক অধ্যায়। কেউ হয়ত অদৃশ্য হাতে সময়ের পাতায় একের পর এক প্রজন্মের নাম লিখে চলেছে। তারা শুধু নিজেদের অংশটুকুতে আছে; তারপর একদিন নিঃশব্দে জায়গা ছেড়ে দিতে হয় পরের জনকে। তারা আলাদা মানুষ, অথচ একই স্রোতের যাত্রী। তারা শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়—তারা পরম্পরা।
পরম্পরা: অদৃশ্য উত্তরাধিকার
এক প্রজন্ম তার অসমাপ্ত স্বপ্ন, অভ্যাস, ভয়, ভালোবাসা আর অদৃশ্য ক্ষত তুলে দেয় পরের প্রজন্মের হাতে। কেউ তা সচেতনভাবে গ্রহণ করে, কেউ অজান্তেই। তবুও উত্তরাধিকার থেমে থাকে না। বাবার হাসি এসে বাসা বাঁধে ছেলের ঠোঁটে, বাবার অভ্যাস ফিরে আসে তার দৈনন্দিনতায়, বাবার না-বলা কথা একদিন তার নিজের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়।
সে আবার সন্তানের দিকে তাকায়। শিশুটি তখনো নিশ্চিন্ত চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। সে হয়ত জানে না, তার মুখের কোনো ভঙ্গিতে ইতোমধ্যেই বাবার ছাপ ফুটে উঠেছে। জানে না, তার ভবিষ্যতের কোনো এক সন্ধ্যায় এই মুহূর্তটিই হয়ত অস্পষ্ট স্মৃতি হয়ে ফিরে আসবে। সে সন্তানের মাথায় হাত রেখে মৃদু হাসে। তার বুকের গভীরে তখন একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। প্রশ্নটি যেন শুধু তার সন্তানের উদ্দেশে নয়; যেন তার বাবাও কোনো এক অদৃশ্য স্থান থেকে একই প্রশ্ন একদিন তাকে করেছিলেন। সে আরেকবার সন্তানের চোখে চোখ রেখে অস্ফুট স্বরে বলে—তু্ইও কি তোর বাবার ছায়া বয়ে বেড়াবি? দেয়ালের ওপর ছোট্ট ছায়াটি তখন বড়ো ছায়াটির সঙ্গে মিশে যায়। কোনটি বাবার, কোনটি সন্তানের—আলাদা করে আর বোঝা যায় না।



