দূর পরবাস: কেপ ভার্দের প্রায়ায় ভোরের সৌন্দর্য ও বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাস
কেপ ভার্দের প্রায়ায় ভোরের সৌন্দর্য ও বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাস

ভোর হচ্ছে। আমি বসে আছি আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে একটা পাথরের ওপরে। সাদা রুপালি রঙের বালুর ওপর ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে কালো পাথর। ধীরে ধীরে আকাশের রং পাল্টাচ্ছে। সূর্য উঠছে। আমি সাগরের নীল পানির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে পৃথিবী তার বিশাল সৌন্দর্য নিয়ে আমার সামনে উদিত হচ্ছে। চারপাশে কেউ নেই। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আকাশে অসংখ্য গাংচিল উড়ছে। আমি ভাবছি। আমি দেখছি। আমি নিঃশব্দ জনহীন সৈকতে সমুদ্রের মোহনীয় রূপ উপভোগ করছি আর ভাবছি...এই ভোর যেন শেষ না হয়!

কেপ ভার্দে: দ্বীপ দেশের রাজধানী প্রায়া

আমি এসেছি আটলান্টিক মহাসাগরে ১১টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত কেপ ভার্দে দেশের রাজধানী প্রায়া। প্রায়া কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় দ্বীপ সান্তিয়াগোর দক্ষিণ কোণায় অবস্থিত। মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটি পাঁচ শত বছর পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। পর্তুগিজ সংস্কৃতির প্রভাব তাই সর্বত্র। স্থাপত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, খাবার, সংগীত ও আচার ব্যবহার সব কিছুতে পর্তুগিজ প্রভাব স্পষ্ট।

কেপ ভার্দে ভ্রমণের কোনো পরিকল্পনা আসলে আমার ছিল না। সেনেগালের রাজধানী ডাকারে বাস করার কারণে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়। ১১টা দ্বীপ নিয়ে গঠিত কেপ ভার্দ সেনেগালের রাজধানী ডাকার থেকে প্রায় ৭০০ মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। ডাকার থেকে মাত্র এক ঘণ্টার বিমান যাত্রায় কেপ ভার্দের রাজধানী প্রায়া পৌঁছানো যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বকাপের আশ্চর্য সাফল্য দেখে পরিকল্পনা বদল

আমার সব পরিকল্পনা উল্টে গেল এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের আশ্চর্য সাফল্য দেখে। স্পেনের সঙ্গে ওদের খেলা দেখার পর আমি ভাবলাম এখনই কেপ ভার্দে বেড়াতে যাওয়ার সঠিক সময়। যেমন ইচ্ছা তেমন কাজ। তিন দিনের ছুটি নিয়ে রাজধানী প্রায়া পৌঁছালাম। ভাবলাম রথ দেখা হবে কলাও বেচা হবে। অর্থাৎ দেশটাও দেখা হবে, সঙ্গে কেপ ভার্দে ও সৌদি আরবের খেলা বন্ধুদের সঙ্গে উদ্‌যাপন করব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রায়া বিমানবন্দরটি খুবই ছোট। আগে থেকে ব্যবস্থা করা ছিল। আমার গাইড এদুয়ার্দো। যাকে সবাই সংক্ষেপে এদো বলে ডাকে। এদো আমাকে নিতে এসেছে। গাড়িতে উঠেই আমি এদোকে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের বিশ্বকাপের সাফল্য নিয়ে অভিনন্দন দিলাম। ‘আমি তো নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না,’ এদো বলে। ‘আমাদের দেশটি খুবই ছোট। মানুষও খুব কম। বিশ্বকাপে এত দূর চলে আসবে আমাদের জাতীয় দল এ আমরা নিজেরাও ভাবতে পারিনি।’

তা তোমার প্রিয় দল কোনটি? আমি প্রায় সব বাংলাদেশিদের মতো বললাম আর্জেন্টিনা। ‘তাই নাকি? আমার প্রিয় দল অবশ্য ব্রাজিল ও জার্মানি। তোমার দেশের ফুটবল দল কেমন? তোমার দেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলেছে?’ আমি বললাম, না; খেলেনি। ‘আচ্ছা তোমার দেশের নাম আরেকবার বলো তো।’

প্রায়া শহরের সৌন্দর্য ও নিরাপত্তা

পরদিন সকালে উঠে আমার প্রায়া শহরে হাঁটতে বেরোলাম। খুবই ছোট শহর, কিন্তু ভীষণ সুন্দর। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাড়িঘর। প্রতিটি বাড়ির রং আলাদা। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ। মনে হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে প্রতিটি বাড়ি আলোর মতো ফুটে আছে। প্রায়ার দুটো অংশ। প্লেটো এলাকাটি পাহাড়ের ওপরে। এটাই পুরোনো প্রায়া। আর নতুন প্রায়া হলো পাহাড়ের নিচে একটা উপত্যকায়। প্লেটোর রাস্তাগুলো খুবই সরু এবং কালো পাথরের। পুরো শহরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে ছোট ছোট পার্ক। পার্কে প্রচুর মানুষের আনাগোনা। কেউ গান গাইছে, কেউ বিভিন্ন রকমারি হস্তশিল্প বিক্রি করছে।

প্রায়া আসার আগেই শুনেছিলাম যে নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি ঘুরতে ঘুরতে রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে গিয়ে পৌঁছলাম। পৌঁছে খুবই অবাক হলাম। কোন ধরনের আড়ম্বর নেই, মাত্র কয়েকজন সৈন্য সামনে দাঁড়ানো। সাধারণ মানুষ ও পর্যটক সবাই ভবনের একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে, কোনো কোলাহল নেই। এমনকি কেপ ভার্দের সঙ্গে সৌদি আরবের খেলার পরও মানুষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখেছি, তা–ও ছিল খুব সুন্দর ও নিয়ন্ত্রিত।

আমি ভেবেছিলাম প্রায়ার চারদিকে নিশ্চয়ই তাদের জাতীয় দলের বড় বড় ব্যানার লাগানো থাকবে। তাদের এই সাম্প্রতিক সাফল্যে উদ্‌যাপনের নিদর্শন আমি দেখতে পাব। কিন্তু এ রকম কিছুই দেখলাম না। সবাই খেলা দেখছে, আনন্দ করছে। কিন্তু উচ্ছ্বাস বাংলাদেশে আমরা খেলা দেখার সময় যে উচ্ছ্বাস দেখি সে রকম নয়।

স্থানীয়দের জীবনদর্শন ও সময়ের ধীর গতি

কটা দিন কাটানোর পর আমার মনে হলো এ দেশের মানুষের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমার বন্ধু এদুয়ার্দোকে জিজ্ঞাসা করলাম কেপ ভার্দিয়ানদের কোন দিকটা তার সবচেয়ে ভালো লাগে? এদো বলল, ‘এ দেশের মানুষ কোনো ধরনের মানসিক চাপ নেয় না। সবাই জীবনকে উপভোগ করে। জীবনের কষ্ট ও সুখ সব কিছুই সহজে গ্রহণ করে।’ এই ব্যাপারটা ওর খুব ভালো লাগে।

দুপুরে খেতে বসে এদোকে বললাম ‘এখানে সময় যেন অনেক ধীরে চলে বলে মনে হচ্ছে। কেন বলো তো?’ এদো হেসে বলে, ‘জানো, এ দেশে একটা কথা আছে। তা হলো, তোমাদের ঘড়ি আছে, কিন্তু সময় নেই। আমাদের অনেক সময় আছে; কারণ, আমরা ঘড়ি ধরে জীবন চালাই না।’

এদোর এ কথাটি আমার খুবই ভালো লাগল। আসলেই আমরা সারা জীবন সুখের আশায় কুহেলিকার পেছনে দৌড়ে বেড়াই। অর্থ, বিত্ত, বৈভব এসবকে জীবনের সাফল্য বলে উদ্‌যাপন করি। এ দেশের মানুষের হয়তো অনেক অর্থবিত্ত নেই। কিন্তু আছে অগাধ সময়, সরল জীবন আর প্রিয়জনের সান্নিধ্য।

প্রায়ার সন্ধ্যা ও সেজারিয়া এভোরার গান

চারদিকে সমুদ্র দিয়ে ঘেরা প্রায়ার সন্ধ্যাগুলো সত্যি অপূর্ব। আমরা বিকেলে এসেছি একটা ছোট কফি শপে। কেপ ভার্দের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সেজারিয়া এভোরার ক্রয়েল ভাষায় গানে যেন সময় থমকে আছে! ‘আমার জীবনে তুমি কেন আবার ফিরে এলে? পুরোনো প্রেম ফিরবে এই আশায় কি এসেছ? ভাঙা প্রেম কি আবার জোড়া লাগে? আমি অগোছালো জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমাকে গোছানো প্রেমের লোভ দেখিও না।’

জোছনার আলোতে আটলান্টিকের নীল পানিকে মনে হচ্ছে এক রুপালি সরোবর। আমরা নির্জন সৈকত দিয়ে চার বন্ধু হাঁটছি। আনা আমায় জোছনা নিয়ে একটা বাংলা কবিতা আবৃত্তি করার জন্য বলে। আমি সাগরের কালো জলের দিকে তাকিয়ে হেলাল হাফিজের প্রস্থান কবিতাটি বলি, ‘এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো। এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালি তাল পাখাটা খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো। ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো। কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে কোন স্মৃতিটা উসকানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বানে পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো।’

আমি সৈকত থেকে একটা সাদা শঙ্খ তুলে নিই হাতে। এবার বন্ধুদের বলি, আজ সারারাত কে আমার সঙ্গে হাঁটবে?