বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ কিংবা বড় কোনো ক্রিকেট-ফুটবল টুর্নামেন্ট এলেই ভক্তদের মধ্যে শুরু হয় আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি। প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে চলে নানা আলোচনা, ভবিষ্যদ্বাণী, এমনকি অনেক সময় শোনা যায়—‘তোর দল জিতলে আমি চা খাওয়াব, আর আমার দল জিতলে তুই বিরিয়ানি খাওয়াবি।’
ইসলামে জুয়া বলতে কী বোঝায়?
ইসলামে জুয়াকে ‘মাইসির’ (الميسر) বা ‘কিমার’ (القمار) বলা হয়। ফকিহদের ভাষায়, এমন লেনদেন বা প্রতিযোগিতা যেখানে অনিশ্চিত ফলাফলের ওপর লাভ-লোকসান নির্ভর করে এবং এক পক্ষের লাভ অন্য পক্ষের ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত হয়, সেটিই জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, আগে থেকেই যদি শর্ত করা হয়— যে হারবে, সে অন্যজনকে টাকা, খাবার, উপহার বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিস দেবে, তাহলে সেটি জুয়ার বৈশিষ্ট্য বহন করে। বস্তুটির মূল্য কম বা বেশি—এটি মুখ্য নয়; বরং মূল বিষয় হলো শর্তযুক্ত অনিশ্চিত লাভ-লোকসান।
চা-নাস্তার বাজিও কি জুয়া?
যদি দুই বন্ধু বলেন—‘তোমার দল জিতলে আমি চা খাওয়াব, আর আমার দল জিতলে তুমি খাওয়াবে’, তাহলে অধিকাংশ ফকিহের মতে এটি কিমার (জুয়া)-এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ—উভয় পক্ষই কিছু হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। খেলার অনিশ্চিত ফলাফলের ওপর অর্থ বা সম্পদ ব্যয় নির্ভর করে। একজনের লাভ অন্যজনের ব্যয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। চাই তা এক কাপ চা, এক প্লেট বিরিয়ানি কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ—যাই হোক না কেন, মূল নীতির দিক থেকে হুকুম একই।
কুরআনের কঠোর সতর্কবার্তা
আল্লাহ তাআলা বলেন—‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়। সুতরাং, তোমরা কি বিরত হবে না?’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৯০–৯১)
জুয়ার প্রস্তাব দিতেও কেন সতর্ক করেছেন নবী (সা.)?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, এসো, আমরা জুয়া খেলি, সে যেন সদকা করে।’ (বুখারি, মুসলিম) এই হাদিস থেকে আলেমরা বলেন, ইসলাম শুধু জুয়া খেলাকেই নয়; বরং জুয়ার সংস্কৃতি ও মানসিকতা থেকেও মুসলমানকে দূরে রাখতে চায়।
কোনটি বৈধ, আর কোনটি নয়?
বৈধ— কেউ স্বেচ্ছায় বলে, ‘আজ আমার দল জিতলে আমি সবাইকে চা খাওয়াব।’ কোনো প্রতিষ্ঠান নিজ অর্থে বিজয়ীদের পুরস্কার ঘোষণা করে। খেলা শেষে বন্ধুরা কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই একসঙ্গে খায়, আর কেউ স্বেচ্ছায় বিল পরিশোধ করে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের কারও সম্পদ ঝুঁকিতে থাকে না; তাই এগুলো জুয়া নয়।
অবৈধ— আগে থেকেই শর্ত করা— ‘যে হারবে, সে খাওয়াবে।’ জয়-পরাজয়ের ভিত্তিতে অর্থ, খাবার বা উপহার দেওয়া বাধ্যতামূলক করা। এ ধরনের শর্তযুক্ত লেনদেনই জুয়ার মূল বৈশিষ্ট্য বহন করে।
নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন
নিচের তিনটি প্রশ্নের উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে অধিকাংশ ফকিহের মতে বিষয়টি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে—
- দুই পক্ষই কি কিছু হারানোর ঝুঁকিতে আছে?
- জয়-পরাজয়ের ওপর কি অর্থ, খাবার বা অন্য কোনো সুবিধা নির্ভর করছে?
- ফলাফল কি অনিশ্চিত?
তিনটির উত্তরই যদি 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকাই একজন মুসলমানের জন্য নিরাপদ।
ইসলাম মানুষের বৈধ আনন্দ, খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে সেই আনন্দ যদি জুয়া, বাজি বা হারাম লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তাহলে তা আর বৈধ থাকে না। অনেক সময় ছোট্ট একটি ‘চা-নাস্তার বাজি’ থেকেই জুয়ার মানসিকতা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের হারাম কাজে নিয়ে যেতে পারে। তাই একজন সচেতন মুসলমানের উচিত খেলার উত্তেজনাকে উপভোগ করা, কিন্তু জয়-পরাজয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের শর্তযুক্ত অর্থ, খাবার বা উপহার বিনিময় থেকে বিরত থাকা। কারণ, কয়েক ঘণ্টার খেলার আনন্দ শেষ হয়ে যায়; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা ও হারাম থেকে বেঁচে থাকার প্রতিদান চিরস্থায়ী।



