বদনজর কি সত্য? ইসলাম কী বলে? লক্ষণ ও প্রতিকার জানুন
বদনজর কি সত্য? ইসলাম কী বলে? লক্ষণ ও প্রতিকার

ইসলামের দৃষ্টিতে বদনজর (আল-আ’ইন) একটি বাস্তব বিষয়, যা কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা স্বীকৃত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে একাধিক হাদিসে বদনজরের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন এবং এর থেকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ইসলাম একই সঙ্গে শিক্ষা দেয়, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে এবং কোনো ক্ষতি বা উপকার তাঁর অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। তাই বদনজর নিয়ে অমূলক ভয়, কুসংস্কার বা ভিত্তিহীন চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ না করে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।

বদনজর সত্য— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—الْعَيْنُ حَقٌّ ‘বদনজর সত্য।’ (আবু দাউদ ৩৮৮০, মুসলিম ২১৮৭) হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنَ الْعَيْنِ، فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ ‘তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কারণ বদনজর সত্য।’ (ইবন মাজাহ ৩৫০৮) এসব হাদিস স্পষ্টভাবে বদনজরের বাস্তবতা প্রমাণ করে।

কীভাবে বুঝবেন বদনজর লেগেছে?

শরিয়তে এমন কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অমুক ব্যক্তির বদনজর লেগেছে। তবে সহিহ হাদিসে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। হজরত উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন— রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি শিশুকে দেখে বললেন—اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ ‘তার জন্য ঝাড়ফুঁক করাও; কারণ তার ওপর বদনজরের প্রভাব রয়েছে।’ (বুখারি ৫৭৩৯, মুসলিম ২১৯৭)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আরেক হাদিসে হজরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) বলেন, জাফর (রা.)-এর সন্তানদের শরীর দুর্বল দেখাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের দ্রুত বদনজর লাগে। তখন নবী (সা.) তাদের জন্য ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দেন। (মুসলিম ২১৯৮) এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, কখনো কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা পরিবর্তন বদনজরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এমন উপসর্গ দেখা দিলেই নিশ্চিতভাবে বদনজর হয়েছে— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি শরঈ রুকইয়াহ করা উচিত।

বদনজরের প্রতিকার কী?

১. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাস পড়ে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এগুলো বদনজর ও সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।

২. জিবরিল (আ.)-এর শেখানো দোয়া
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, জিবরিল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করেন—بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহি আরক্বিকা, মিন কুল্লি শাই'ইন ইউ’জিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আ’ইনিন হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।’ অর্থ: ‘আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি—প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক প্রাণের অনিষ্ট এবং প্রত্যেক হিংসুকের বদনজর থেকে। আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি।’ (মুসলিম ২১৮৬)

৩. বদনজরদাতাকে জানা গেলে
সহিহ হাদিসে এসেছে, যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় কার বদনজর লেগেছে, তাহলে তাকে অজু বা গোসল করতে বলা হবে এবং সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢেলে দেওয়া হবে। (আবু দাউদ ৩৮৮০, মুসনাদ আহমাদ ১৫৯৮০)

যেসব কাজের শরয়ি ভিত্তি নেই

বদনজর দূর করার নামে—পশুর হাড় ঝুলিয়ে রাখা, তাবিজকে নিজে নিজে কার্যকর মনে করা, সোনা বা রূপা ধোয়া পানি পান করাকে সুন্নাহ মনে করা, বিভিন্ন কুসংস্কার ও লোকজ বিশ্বাস অনুসরণ করা—এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য শরঈ প্রমাণ নেই। একজন মুসলিমের উচিত কুরআন, সহিহ হাদিস ও বৈধ রুকইয়াহর ওপর নির্ভর করা।

বদনজর বাস্তব এবং এটি কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে এর কারণে অতিরিক্ত ভয়, সন্দেহ বা কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া ইসলামের শিক্ষা নয়। কোনো অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে কুরআনের আয়াত, মাসনুন দোয়া এবং শরয়িসম্মত রুকইয়াহর মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করাই একজন মুমিনের পথ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিংসুকের অনিষ্ট, বদনজর এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের অকল্যাণ থেকে হেফাজত করুন। তিনি আমাদের ঈমান, পরিবার ও নেয়ামতসমূহকে তাঁর বিশেষ নিরাপত্তায় রাখুন। আমিন।