হাবিব আল-আজামির জীবন ও পরিচয়
হাবিব আল-আজামির পুরো নাম হাবিব ইবনে মোহাম্মদ আল-আজামি আল-বসরি। পারস্যে জন্ম নেওয়া এই সাধক পরবর্তীকালে বসরায় স্থায়ী হন। জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডলে একজন নির্ভরযোগ্য হাদিস বিশারদ হিসেবে তিনি সমাদৃত ছিলেন। আল-হাসান আল-বসরি, ইবনে সিরিনসহ সমকালীন বরেণ্য ব্যক্তিদের সূত্রপরম্পরায় তিনি হাদিস বর্ণনা করেছেন। মূলত বসরার হাসানের (হাসান বসরি) বাগ্মিতাই হাবিবের আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসে মগ্ন জীবনকে পাল্টে দিয়েছিল। তিনি নিয়মিত হাসানের পাঠদানে অংশ নিতেন এবং ক্রমে তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচরে পরিণত হন।
প্রথম জীবনে হাবিবের কাহিনি
প্রথম জীবনে হাবিব ছিলেন একজন ধনাঢ্য মানুষ এবং সুদি কারবারি। তিনি থাকতেন বসরায় আর প্রতিদিন বের হয়ে ঋণগ্রহীতাদের টাকার তাগাদা দিতেন। পাওনা উশুল না হলে, অন্তত হেঁটে আসার ‘জুতার ক্ষয়পূরণ’ বাবদ একটা অঙ্ক দাবি করতেন। এভাবেই তিনি তাঁর দৈনন্দিনের খরচ মেটাতেন। একদিন তিনি এক ঋণগ্রহীতার খোঁজে গেলেন। ওই লোক বাড়িতে ছিলেন না। তাঁকে না পেয়ে হাবিব তাঁর স্ত্রীর কাছে জুতার চামড়ার ক্ষতিপূরণ চাইলেন। ‘আমার স্বামী তো বাড়িতে নেই’, ঋণগ্রহীতার স্ত্রী বললেন, ‘আমার নিজের কাছেও আপনাকে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তবে আমরা একটা ভেড়া জবাই করেছিলাম, কিন্তু এখন শুধু এর ঘাড়ের অংশটুকু বাকি আছে। যদি চান তো সেটাই আপনাকে দিতে পারি।’ ‘তা-ই সই,’ হাবিব মনে মনে ভাবলেন—অন্তত ভেড়ার ঘাড়টা তো পাওয়া গেল, এটুকুই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে। ‘চুলায় পাতিল বসাও’, তিনি বললেন। ‘আমার কাছে না আছে রুটি, না জ্বালানি’, নারীটি জবাব দিলেন। ‘ঠিক আছে, আমি গিয়ে জ্বালানি আর রুটি নিয়ে আসছি। জুতার চামড়া ক্ষয়ের উশুল হিসেবে ওটুকুই ধরা যাক।’ এই বলে হাবিব বেরিয়ে গেলেন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে এলেন। নারীটি চুলায় পাতিল বসালেন। রান্না শেষ করে যখন মাংস বাটিতে ঢালতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এক ভিক্ষুক কড়া নাড়লেন। ‘আমাদের কাছে যা আছে, সেটা যদি তোকে দিয়ে দিই,’ হাবিব তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুই বড়লোক হবি না, উল্টো আমরা নিজেরাই ফকির হয়ে যাব।’
ভিক্ষুকের ঘটনা ও রক্তে পরিণত খাবার
নিরাশ হয়ে ওই ভিক্ষুক তখন নারীটির কাছে আকুতি জানালেন, তাঁর বাটিতে যেন অন্তত কিছু একটা দেওয়া হয়। নারীটি পাতিলের ঢাকনা তুলতেই দেখলেন—ভেতরের সব খাবার কুচকুচে কালো রক্তে পরিণত হয়েছে! ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে তিনি দ্রুত ছুটে এলেন এবং হাবিবের হাত ধরে টানতে টানতে তাঁকে পাতিলের কাছে নিয়ে গেলেন। ‘দেখ! তোমার এই অভিশপ্ত সুদ আর ওই ভিক্ষুককে ও রকম ধমকানোর কারণে আমাদের একি দশা হয়েছে!’ নারীটি কেঁদে উঠলেন, ‘এই পৃথিবীতেই এখন আমাদের কী হবে, পরকালের কথা আর না-ইবা বললাম!’ এই দৃশ্য দেখে হাবিব তাঁর ভেতর এক আগুন অনুভব করলেন, যা পরে আর কখনো নিভল না। ‘হে নারী’, তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি অনুতপ্ত—এতকাল যা করেছি তার জন্য।’
তওবা ও সম্পদ বিতরণ
পরদিন তিনি আবার ঋণগ্রহীতাদের খোঁজে বের হলেন। ওই দিন ছিল শুক্রবার। বাচ্চারা রাস্তায় খেলাধুলা করছিল। হাবিবকে দেখামাত্রই তারা চিৎকার শুরু করল, ‘ওই দেখো, সুদখোর হাবিব আসছে! পালাও, নইলে ওর গায়ের ধুলো আমাদের গায়ে লাগবে আর আমরাও ওর মতো অভিশপ্ত হয়ে যাব!’ বাচ্চাদের এই কথাগুলো হাবিবকে গভীরভাবে আঘাত করল। তিনি সোজা হাসান বসরির মজলিসের দিকে রওনা হলেন। সেখানে হাসানের মুখ থেকে উচ্চারিত নির্দিষ্ট কিছু কথা সরাসরি হাবিবের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধল—এতটাই যে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। এরপর তিনি তওবা করলেন। কী ঘটেছে, উপলব্ধি করে হাসান তাঁর হাত ধরলেন এবং তাঁকে শান্ত করলেন।
সভা থেকে ফেরার পথে এক ঋণগ্রহীতার সঙ্গে হাবিবের সাক্ষাৎ হলো, তাঁকে দেখামাত্রই লোকটা পালাতে উদ্যত হলেন। ‘পালিয়ে যেয়ো না,’ হাবিব তাঁকে ডেকে বললেন, ‘এতকাল আমার থেকে তোমার পালানোর কথা ছিল, কিন্তু এখন আমারই তোমার থেকে পালানো উচিত।’ তিনি পথ চলতে থাকলেন। বাচ্চারা তখনো খেলা করছিল। হাবিবকে দেখামাত্র তারা আবারও চিৎকার করে উঠল, ‘ওই যে আসছে, তওবাকারী হাবিব! পালাও, যেন আমাদের গায়ের ধুলো ওনার শরীরে না লাগে, আমরা তো আল্লাহর কাছে পাপী।’ ‘আমার মালিক-মাওলা!’ হাবিব কেঁদে উঠলেন, ‘মাত্র একটা দিন হলো আমি তোমার সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেছি, এরই মধ্যে তুমি মানুষের হৃদয়ে আমার নামের ঢাক বাজিয়েছ, আর আমার পুণ্যের কথা চারদিক ছড়িয়ে দিয়েছ!’ এরপর তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘যে কেউ হাবিবের কাছে কিছু চাও—আসো এবং সেটা নিয়ে নাও!’
উৎসুক লোকেরা জড়ো হলো এবং হাবিব তাঁর সব ধনসম্পদ তাদের বিলিয়ে দিলেন, যতক্ষণ না তিনি পুরোপুরি নিঃস্ব হলেন। তখন আরেকজন লোক একটা দাবি নিয়ে এল। দেওয়ার মতো আর কিছুই না থাকায় হাবিব নিজের স্ত্রীর চাদরটি তাকে দিয়ে দিলেন। পরে আরও একজন দাবিদার আসায় তিনি তাঁর পরনের জামাটিও খুলে দিলেন এবং রিক্ত হয়ে পড়লেন। এরপর তিনি ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর তীরে এক নির্জন কুটিরে আশ্রয় নিলেন এবং সেখানে নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন করলেন। প্রতিদিন ও রাতে তিনি হাসান বসরির কাছে পাঠ গ্রহণ করতেন। কিন্তু কোনোভাবেই কোরআন আয়ত্ত (আরবির সঠিক উচ্চারণ) করতে পারছিলেন না, এ কারণে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘আজামি’ বা অনারব (আনাড়ি)।
আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক সাহায্য
দিন কাটতে থাকল এবং একসময় হাবিব পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়লেন। এদিকে তাঁর স্ত্রী সংসার খরচার জন্য লাগাতার ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগলেন। উপায় না দেখে, হাবিব তাঁর ঘর ছেড়ে সেই নির্জন আস্তানায় ফিরে এলেন এবং উপাসনায় মগ্ন হলেন। রাত হলে তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছে ফিরতেন। ‘কোথায় কাজ করছ তুমি,’ তাঁর স্ত্রী জেরা করলেন, ‘যে বাড়িতে কিছুই আনছ না?’ ‘যাঁর অধীনে আমি কাজ করছি, তিনি অত্যন্ত দয়ালু,’ হাবিব জবাব দিলেন। ‘তিনি এতটাই উদার আর মহানুভব যে তাঁর কাছে মজুরি চাইতে আমার লজ্জা লাগে। সঠিক সময় যখন আসবে, তিনি নিজ থেকেই দেবেন। কারণ, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—“প্রতি ১০ দিন অন্তর আমি মজুরি মিটিয়ে দিই।”’
এভাবে হাবিব রোজ সেই নির্জন ডেরায় গিয়ে ইবাদত করতে থাকলেন, ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগপর্যন্ত। দশম দিনে, জোহরের নামাজের সময় তাঁর মনে একটা দুশ্চিন্তা ভর করল—‘আজ রাতে আমি কী নিয়ে ঘরে ফিরব, আর স্ত্রীকেই–বা কী বলব?’ তিনি যখন বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মহামহিম, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বাড়ির দরজায় একটা গাধাবোঝাই আটা নিয়ে একজন কুলি পাঠালেন। আরেকজন এল চামড়াছেলা একটা ভেড়া নিয়ে, অন্য একজন নিয়ে এল তেল, মধু, শাকসবজি ও নানা মসলা। বাহকেরা সব জিনিস একে একে নামাল। তাদের সঙ্গে ছিলেন সুদর্শন এক যুবক—হাতে ৩০০ রুপার দিরহাম ভরা একটা থলে। হাবিবের বাড়ির কাছে এসে সে দরজায় কড়া নাড়ল। ‘কী চাই তোমার?’ দরজা খুলে হাবিবের স্ত্রী জানতে চাইলেন। ‘মালিক এসব পাঠিয়েছেন,’ সেই সুদর্শন যুবক জবাব দিল। ‘হাবিবকে বলবেন, তুমি তোমার কাজের পরিধি বাড়িয়ে দাও, আমরাও তোমার বেতন বাড়িয়ে দেব।’ এই কথা বলে যুবকটি প্রস্থান করল। রাত নামলে হাবিব ঘরের দিকে রওনা হলেন, লজ্জিত ও বিষণ্ন মন নিয়ে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই তাঁর নাকে ভেসে এল রুটি আর রান্নার সুঘ্রাণ। স্বামীকে দেখামাত্রই স্ত্রী দৌড়ে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন, মুখও মুছে দিলেন গভীর যত্নে। আর তাঁর সঙ্গে নরম আচরণ করলেন, যেমনটা সে এর আগে কখনো করেননি। ‘শুনছ,’ স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘তুমি যাঁর অধীনে কাজ করছ, তিনি তো দারুণ এক ভদ্রলোক, উদার এবং দরদ-মমতায় পূর্ণ। দেখো, এক সুদর্শন যুবক মারফত তিনি কী কী পাঠিয়েছেন! আর ওই যুবক এই বলে গেল—হাবিব যখন ঘরে ফিরবেন, তাঁকে বলো: “তুমি তোমার কাজের পরিধি বাড়িয়ে দাও, আমরাও তোমার মজুরি বাড়িয়ে দেব।”’ এই কথা শুনে হাবিব বিস্মিত ও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ‘আশ্চর্য!’ তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘মাত্র ১০টা দিন আমি তাঁর হয়ে কাজ করলাম, আর তিনি আমার ওপর এতটা অনুগ্রহ করলেন! আমি যদি আরও পরিশ্রম করি, কে জানে তাহলে তিনি কী করবেন!’ এরপর তিনি দুনিয়াবি সবকিছু থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর সেবায় সমর্পণ করলেন।
হাবিবের কেরামতি
একদিন এক বৃদ্ধা হাবিবের কাছে এসে তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন এবং হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলেন। ‘আমার একটা ছেলে আছে, অনেক দিন ধরে সে আমার থেকে দূরে। ওর এই বিচ্ছেদ আমি আর সহ্য করতে পারছি না,’ হাবিবের কাছে বৃদ্ধা মিনতির সুরে বললেন, ‘আল্লাহর কাছে একটু প্রার্থনা করুন। হয়তো আপনার দোয়ার বরকতে আল্লাহ ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবেন।’ ‘তোমার কাছে কি টাকাপয়সা কিছু আছে?’, হাবিব জিজ্ঞেস করলেন। ‘হ্যাঁ, দুই দিরহাম আছে,’ বৃদ্ধা জবাব দিলেন। ‘ওটা নিয়ে এসো এবং দরিদ্রদের দান করে দাও।’ বৃদ্ধা তা-ই করলেন। হাবিব তখন আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। দোয়া শেষ করে বৃদ্ধাকে বললেন, ‘এবার বাড়ি যাও। তোমার ছেলে তোমার কাছে ফিরে এসেছে।’
বৃদ্ধা তখনো নিজের বাড়ির দরজায় পৌঁছাননি, এর আগেই তিনি তাঁর ছেলেকে দেখতে পেলেন। ‘আরে, এই তো আমার ছেলে!’ তিনি চিৎকার করে উঠলেন এবং তাকে সঙ্গে করে হাবিবের কাছে এলেন। ‘কী ঘটেছিল?’ হাবিব ছেলেটির কাছে জানতে চাইলেন। ‘আমি কেরমান শহরে ছিলাম,’ ছেলেটি উত্তর দিল, ‘আমার ওস্তাদ আমাকে কিছু মাংস আনতে পাঠিয়েছিলেন। আমি মাংস কিনে মাত্রই তাঁর কাছে ফিরছিলাম, এমন সময় আচমকা এক বাতাস এসে আমাকে তুলে নিল। তখন আমি এক কণ্ঠকে বলতে শুনলাম, “বাতাস, তাকে তার নিজের ঘরে পৌঁছে দাও, হাবিবের দোয়া এবং দান করা সেই দুই দিরহামের বরকতে।”’ আরেক বছর জিলহজ মাসের ৮ তারিখ হাবিবকে দেখা গেল বসরায়, আর ৯ তারিখ আরাফাতের ময়দানে।
দুর্ভিক্ষে অলৌকিক সাহায্য
একবার বসরায় ভয়াবহ এক দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। হাবিব ধার করে প্রচুর খাদ্যসামগ্রী কিনলেন এবং সেগুলোকে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন। এরপর তিনি তাঁর মানিব্যাগটি আটকে বালিশের নিচে রেখে দিলেন। পাওনাদার ব্যবসায়ীরা যখনই টাকা চাইতে আসত, তিনি বালিশের নিচ থেকে তাঁর ব্যাগটি বের করতেন, আর প্রতিবারই সেটা দিরহামে ভরা থাকত। সেখান থেকেই তিনি তাঁর ঋণ পরিশোধ করতেন।
হাসান বসরির সঙ্গে ঘটনা
বসরা শহরের এক চৌরাস্তায় হাবিবের একটা বাড়ি ছিল। তাঁর একটা পশমি কোটও ছিল, যা তিনি গ্রীষ্ম ও শীত—দুই ঋতুতেই পরতেন। একবার, অজু করার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং কোটটি মাটির ওপর ফেলে রেখে চলে গেলেন। ঠিক ওই মুহূর্তে বসরার হাসান সেই পথ ধরে যাচ্ছিলেন, তিনি দেখলেন কোটটি রাস্তার ওপর বেখেয়ালে পড়ে আছে। ‘এই “বর্বর” লোকটা দেখি এর মূল্যই জানে না,’ তিনি মনে মনে ভাবলেন। ‘এই পশমি কোটটাকে এভাবে এখানে ফেলে রাখা একদম ঠিক হবে না। এটা চুরি হয়ে যেতে পারে।’ তাই তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে কোটটি পাহারা দিতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর হাবিব ফিরে এলেন। ‘মুসলমানদের হে ইমাম,’ হাসানকে সালাম দিয়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ ‘তুমি কি জানো না,’ হাসান জবাব দিলেন, ‘এই কোটটা এখানে ওভাবে ফেলে রাখা একদম ঠিক হয়নি? এটা তো হারিয়েও যেতে পারত। বলো, কার জিম্মায় তুমি এটা রেখে গিয়েছিলে?’ ‘তাঁর জিম্মায়,’ হাবিব উত্তরে বললেন, ‘যিনি আপনাকে এর পাহারায় নিযুক্ত করেছেন।’
একদিন হাসান এলেন হাবিবের সঙ্গে দেখা করতে। হাবিব তাঁর সামনে দুটি যবের রুটি ও সামান্য লবণ এনে রাখলেন। হাসান যখন খাওয়া শুরু করেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এক ভিক্ষুক এসে দাঁড়াল। হাবিব সেই রুটি ও লবণ পুরোটাই তাকে দিয়ে দিলেন। ‘হাবিব,’ বিস্মিত হাসান বলে উঠলেন, ‘মানুষ হিসেবে তুমি অতি উত্তম। কিন্তু তোমার যদি সামান্য কাণ্ডজ্ঞান থাকত, তাহলে আরও ভালো হতো। তুমি তোমার মেহমানের মুখের সামনে থেকে রুটি তুলে নিয়ে সবটাই ওই ভিক্ষুককে দিয়ে দিলে! তোমার উচিত ছিল কিছু অংশ ভিক্ষুককে দেওয়া আর বাকিটা অতিথির জন্য রাখা।’ হাবিব কিছুই বললেন না। কিছুক্ষণ পর এক দাস মাথায় একটা থালা নিয়ে ঘরে ঢুকল। সেই থালায় ছিল আস্ত এক ঝলসানো ভেড়া, সঙ্গে মিষ্টি, উন্নতমানের রুটি ও ৫০০ রুপার দিরহাম। সে থালাটি হাবিবের সামনে রাখল। হাবিব টাকাগুলো দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন এবং থালাটি এনে রাখলেন হাসানের সামনে। হাসান যখন সেই ঝলসানো মাংস থেকে কিছুটা মুখে তুলেছেন, হাবিব তখন বলে উঠলেন, ‘গুরু, আপনি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো। কিন্তু আপনার যদি সামান্য “বিশ্বাস” থাকত, তবে আরও ভালো হতো। জ্ঞানের সঙ্গে বিশ্বাস থাকাটাও কিন্তু ভীষণ প্রয়োজন।’
হাসানকে রক্ষা
একদিন হাজ্জাজের (হাজ্জাজ বিন ইউসুফ) কর্মকর্তারা হাসানের খোঁজ করছিল। হাসান তখন হাবিবের খানকায় লুকিয়ে ছিলেন। ‘তুমি কি আজ হাসানকে দেখেছ?’ কর্মকর্তারা হাবিবকে জেরা করল। ‘হ্যাঁ, দেখেছি’, হাবিব উত্তর দিলেন। ‘সে কোথায় আছে?’ ‘এই খানকার ভেতরেই।’ কর্মকর্তারা খানকার ভেতরে ঢুকল, কিন্তু চারদিক তন্নতন্ন করে খুঁজেও তারা হাসানকে কোথাও পেল না। (পরে হাসান বলেছিলেন, ‘ওরা সাতবার আমার গায়ের ওপর হাত দিয়েছে, অথচ আমাকে দেখতেই পেল না!’) ‘হাবিব,’ খানকা থেকে বের হতে হতে হাসান বললেন, ‘তুমি তোমার গুরুর প্রতি কর্তব্য পালন করলে না। তুমি তো আমাকে দেখিয়ে দিলে।’ ‘গুরু’, হাবিব উত্তর দিলেন, ‘আমি সত্য বলেছিলাম বলেই আপনি বেঁচে গেছেন। আমি যদি মিথ্যা বলতাম, তবে আমরা দুজনই গ্রেপ্তার হতাম।’ ‘তুমি কী পাঠ করেছিলে যে ওরা আমাকে দেখতে পেল না?’, হাসান জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমি সিংহাসনের স্তবক (আয়াতুল কুরসি) পাঠ করেছি ১০ বার,’ উত্তরে হাবিব বললেন, ‘১০ বার আমি পাঠ করেছি—“রাসুল বিশ্বাস স্থাপন করেছেন…” (আ-মানার রাসুলু…, সুরা বাকারার শেষাংশ), আর ১০ বার—“বলো, তিনি আল্লাহ, (যিনি) অদ্বিতীয়” (সুরা ইখলাস)। এরপর আমি মোনাজাত করেছি—“হে আল্লাহ, আমি হাসানকে আপনার জিম্মায় সোপর্দ করলাম, আপনি তাঁকে হেফাজত করুন”।’
পানির ওপর হাঁটা
একবার হাসান একটা নির্দিষ্ট স্থানে যেতে চাইলেন। তিনি দজলা (টাইগ্রিস) নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালেন এবং গভীর চিন্তায় ডুবে রইলেন। এমন সময় হাবিব সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। ‘ইমাম, আপনি এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ হাবিব জানতে চাইলেন। ‘আমি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে চাইছি,’ হাসান জবাব দিলেন, ‘কিন্তু নৌকা আসতে দেরি করছে।’ ‘গুরু, আপনার কী হয়েছে?’ হাবিব জানতে চাইলেন, ‘আমি যা জানি, তার সবটাই তো আপনার কাছ থেকে শেখা। আপনার হৃদয় থেকে অন্যের প্রতি সব ঈর্ষা মুছে ফেলুন। জাগতিক সব মোহ থেকে অন্তরকে আড়াল করুন। জেনে রাখুন—দুঃখ-কষ্ট এক অমূল্য পুরস্কার, আর বিশ্বাস রাখুন—সব বিষয়ের নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ। এরপর পানির ওপর পা রাখুন আর হাঁটতে শুরু করুন।’ এই বলে হাবিব পানির ওপর পা রাখলেন এবং হেঁটে চলে গেলেন। হাসান অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফেরার পর লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘মুসলমানদের হে ইমাম, আপনার কী হয়েছিল?’ ‘আমার শিষ্য হাবিব এইমাত্র আমাকে ভর্ৎসনা করল,’ তিনি জবাব দিলেন, ‘এরপর সে পানির ওপর দিয়ে হেঁটে চলে গেল, আর আমি এখানে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম। যদি আগামীকাল কোনো আহ্বান আসে—“অগ্নিপথ (পুলসিরাত) পার হও”—আর আমি যদি এইভাবে অক্ষম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন আমি কী করব?’ পরে হাসান হাবিবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এই ক্ষমতা তুমি কী করে আবিষ্কার করলে?’ ‘কারণ আমি আমার হৃদয়কে সাদা করি’, হাবিবের জবাব, ‘আর আপনি কাগজকে কালো করেন।’ ‘আমার জ্ঞান অন্যদের উপকারে এল ঠিকই, কিন্তু তা আমার নিজেরই কোনো কাজে লাগল না।’ হাসানের মন্তব্য।
টীকা: কেরামতির ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই এগুলোকে ধ্রুপদি সাহিত্য এবং নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করলে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বিভ্রান্তি এড়ানো যাবে।



