ভুয়া ফটোকার্ড ও মিথ্যা সংবাদে লাইক-শেয়ার: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ভুয়া ফটোকার্ড ও মিথ্যা সংবাদে লাইক-শেয়ার: ইসলাম কী বলে?

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই একটি সংবাদ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন অসংখ্য পোস্ট, ফটোকার্ড ও সংবাদ আমাদের চোখে পড়ে। অনেক সময় আবেগ, ভালো লাগা বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে আমরা কোনো খবর যাচাই না করেই লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করে ফেলি। অথচ ইসলাম আমাদের শুধু মিথ্যা বলা থেকেই নয়, মিথ্যার প্রচার ও প্রসারে সহযোগিতা করতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তাই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব হলো কোনো তথ্য প্রচার বা সমর্থনের আগে তার সত্যতা যাচাই করা। কেননা এক ক্লিকের গুনাহ: ভুয়া ফটোকার্ড, মিথ্যা সংবাদ ও লাইক-শেয়ারের রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি।

মিথ্যা রচনা ও প্রচার: ইসলামে গুরুতর অপরাধ

মিথ্যা বলা, মিথ্যা সংবাদ তৈরি করা কিংবা ভুয়া ফটোকার্ড বানানো— সবই ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ ‘মিথ্যা রচনা তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না। আর তারাই প্রকৃত মিথ্যাবাদী।’ (সুরা আন নাহল: আয়াত ১০৫) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন— إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞকে হিদায়াত দেন না।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৩) ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা কিংবা মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা মূলত মিথ্যা রচনারই একটি আধুনিক রূপ। তাই এসব কাজে জড়িত ব্যক্তিরাও এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত।

মিথ্যা প্রচারে সহযোগিতাও গুনাহ

অনেকেই মনে করেন, আমি তো মিথ্যা বানাইনি; শুধু শেয়ার করেছি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা প্রচারে সহযোগিতা করাও অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়েদাহ: আয়াত ২) অতএব, মিথ্যা সংবাদে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার দেওয়া সেই মিথ্যার প্রসারে সহযোগিতা করার শামিল; যা কবিরা গুনাহের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রচার নয়

ইসলাম সংবাদ যাচাইয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজরাত: আয়াত ৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই আয়াতের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ একটি মিথ্যা সংবাদ মুহূর্তেই বিভ্রান্তি, অপবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

মিথ্যা বলা: মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য

রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যাকে মুনাফিকির অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে পাকে এসেছে— آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি— যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং যখন আমানত রাখা হয় তখন খিয়ানত করে।’ (বুখারি) এ হাদিস একজন মুসলমানকে সতর্ক করে দেয় যে, মিথ্যা কোনো সাধারণ দোষ নয়; বরং এটি মুনাফিকির অন্যতম চিহ্ন।

যা শুনি তাই প্রচার করা কেন বিপজ্জনক?

অনেক সময় আমরা কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করেই অন্যদের কাছে পৌঁছে দিই। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন— كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম) আজকের ডিজিটাল যুগে এই হাদিস যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি শেয়ার বা ফরওয়ার্ডের মাধ্যমে আমরা অজান্তেই মিথ্যার বাহক হয়ে যেতে পারি।

মিথ্যার ভয়াবহ পরিণতি

মিথ্যা শুধু একটি পাপ নয়; এটি মানুষকে আরও বড় পাপের দিকে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَلَعْنَتُ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ ‘আর মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৬১) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ ‘তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লাইক, কমেন্ট কিংবা শেয়ার অনেক সময় আমাদের কাছে সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু যদি তা মিথ্যা, অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রসারে ভূমিকা রাখে, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে সেটি গুরুতর গুনাহের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ডে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে তার সত্যতা যাচাই করা, মিথ্যা ও অপপ্রচার থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া। মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের দিন আমাদের জিহ্বার পাশাপাশি আমাদের আঙুলের ক্লিকেরও হিসাব দিতে হবে।