ইসলামে কোনো আমল সঠিকভাবে আদায়ের প্রথম শর্ত হলো ইলম বা জ্ঞান অর্জন। কারণ না জেনে কোনো ইবাদত করলে তা শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হয় না, আবার ইবাদতের আসল উদ্দেশ্যও হারিয়ে যায়। কুরবানি এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা পালনের আগে এর প্রকৃত অর্থ, উদ্দেশ্য ও নিয়ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
অনেকেই কুরবানি করেন, কিন্তু কুরবানি আসলে কী, কেন করা হয়, এর মাধ্যমে আল্লাহ কী দেখতে চান—সে বিষয়ে সবার স্পষ্ট ধারণা নেই। অথচ কুরবানির মূল শিক্ষা লুকিয়ে আছে অন্তরের তাকওয়া, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মধ্যে।
কুরবানি কী? আল্লাহ কী বলেছেন?
কুরবানি হলো মনের তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা। কুরবানিতে যদি লোক দেখানো, সামাজিক মর্যাদা লাভ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন: "আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া।" (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৭) এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কুরবানির আসল বিষয় পশুর আকার বা দাম নয়; বরং নিয়তের বিশুদ্ধতা।
কুরবানির আগে নিজেকে যে প্রশ্নগুলো করুন
কুরবানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন মুমিনের কিছু বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত:
- আমি কেন কুরবানি করছি?
- এই কুরবানি কি শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য?
- কুরবানির সময় আমার হৃদয়ের অবস্থা কেমন?
- আমি কি লোক দেখানোর জন্য বড় পশু কিনছি?
- কুরবানির গোশত ও রক্ত কি সত্যিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আন্তরিকভাবে খোঁজা হলে বোঝা যায়—কুরবানি মূলত আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার শিক্ষা।
কুরবানির সময় মুমিনের অন্তরে যেমন অনুভূতি থাকা উচিত
কুরবানি করার সময় প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে এই নিয়ত থাকা জরুরি: "হে আল্লাহ! শুধু তোমার সন্তুষ্টির জন্যই আমি কুরবানি করছি। তুমি আমাদের কুরবানি কবুল করে নাও।" কারণ আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; পৌঁছে শুধু বান্দার খাঁটি নিয়ত ও তাকওয়া। এ জন্য কুরবানির আগে নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়ত বিশুদ্ধ না হলে কুরবানির প্রকৃত সওয়াব থেকে মানুষ বঞ্চিত হবে।
লোক দেখানো কুরবানি কেন ভয়ংকর?
বর্তমান সমাজে অনেক সময় কুরবানি ইবাদতের চেয়ে প্রতিযোগিতার রূপ নেয়। কেউ বড় পশু কেনার প্রতিযোগিতায় নামে, কেউ দামি পশু এনে মানুষের প্রশংসা কুড়াতে চায়। অনেকের মুখে শোনা যায়: "কে সবচেয়ে বড় গরু কিনলো? কার পশুর দাম সবচেয়ে বেশি? কে সবচেয়ে বেশি পশু কুরবানি করল?" এ ধরনের মানসিকতা কুরবানির আত্মাকে নষ্ট করে। কারণ ইবাদত তখনই ইবাদত হয়, যখন তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।" (বুখারি) অতএব, নিয়ত যদি লোক দেখানো হয়, তাহলে সেই কুরবানি ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।
কুরবানির কিছু ভুল উদ্দেশ্য
সমাজে কিছু ভুল উদ্দেশ্য দেখা যায়, যা কুরবানির সৌন্দর্য নষ্ট করে:
- গোশতের লাভের চিন্তা: কেউ কুরবানিকে গোশত পাওয়ার মাধ্যম মনে করে। অথচ এতে কুরবানির মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়।
- নেতৃত্ব বা প্রভাব প্রতিষ্ঠা: কেউ সমাজে নিজেকে প্রভাবশালী বা নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কুরবানি করে। এটি ইখলাসের পরিপন্থি।
- নাম-যশ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা: অনেকে একাধিক বড় পশু কুরবানি করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। সামাজিক মর্যাদা ও প্রশংসা পাওয়ার নিয়ত থাকলে সেই কুরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
কুরবানি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে
আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আলেম-ওলামা ও ইসলামিক স্কলারদের আলোচনা, ওয়াজ-মাহফিল ও গণমাধ্যমের কারণে মানুষ কুরবানি সম্পর্কে আগের তুলনায় অনেক সচেতন হয়েছে। অনেকেই এখন কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে ইবাদত পালনের চেষ্টা করছেন। তবে অসতর্কভাবে বলা কিছু কথা বা অন্তরের গোপন নিয়ত কুরবানির সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে। তাই কুরবানির আগে বারবার নিজের অন্তরকে যাচাই করা জরুরি। কুরআনের এই আয়াত বেশি বেশি স্মরণে রাখুন: "আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া।" (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৭)
কুরবানি কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এটি বান্দার অন্তরের ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাই কুরবানির আগে পশু কেনার চেয়ে বেশি জরুরি নিজের নিয়তকে শুদ্ধ করা। আমরা যেন কুরবানিকে অহংকার, প্রতিযোগিতা বা লোক দেখানোর মাধ্যম না বানাই। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মতো নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খাঁটি নিয়তে কুরবানি করার, ইবাদতের হক আদায় করার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।



