ঢালিউড অভিনেত্রী পরীমনি চার বছর আগে র্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। শুক্রবার (১০ জুলাই) রাত ১২টা ২০ মিনিটে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট তাকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে’ এবং ‘বিশেষ মহলের স্বার্থে’ গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই ঘটনায় তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গ্রেফতারের পটভূমি ও অভিযোগ
২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমনিকে গ্রেফতার করে র্যাব-১। পরে র্যাবের কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমান বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মাদক মামলার অভিযোগে বলা হয়, পরীমনির বাসা থেকে বিদেশি মদ, চার গ্রাম আইস (ক্রিস্টাল মেথ) এবং একটি এলএসডি ব্লট উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ১০-এ সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
পরীমনি তার পোস্টে র্যাবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সম্প্রতি একটি অনলাইন টকশোতে তিনি এমন কিছু তথ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, যার মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পেরেছেন— বনানীতে তার বাসায় দীর্ঘ অভিযানের পর তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে তাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
২৮ দিন কারাগারে ও ক্ষতির কথা
পরীমনি বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে টানা ২৮ দিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেই সময় আমার জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করেছে, তা আল্লাহ আর আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কারও পক্ষে পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার জীবনের একটি অধ্যায় আমাকে একজন শিল্পী হিসেবে, একজন নারী হিসেবে এবং একজন মানুষ হিসেবে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। সেই ঘটনার কারণে আমার ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত জীবন— সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্ন ও ন্যায়বিচার চাওয়া
অভিনেত্রী বলেন, গ্রেফতারের পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি ওই ঘটনার একজন ভুক্তভোগী হিসেবেই জীবন কাটাচ্ছেন। ‘যেভাবে আমাকে অপদস্থ করা হয়েছে, আমার সম্মান, নৈতিকতা ও চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।’
রাষ্ট্রকে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমার সেই দিনগুলো কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? যে জীবন, যে সম্মান, যে মানসিক শান্তি আমি হারিয়েছি, তা কি আর কখনো ফিরে পাব? মানুষের মনে আমাকে নিয়ে যে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত ধারণা তৈরি করা হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে?’
প্রতিশোধ নয়, সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকতে চান বলে জানিয়েছেন পরীমনি। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে ছোট করতে চাই না, কাউকে অপমানও করতে চাই না। আমি শুধু চাই— ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এ ধরনের অন্যায়ের শিকার না হন।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অন্যান্য মামলা
অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়াতে চাই না। আমি সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমি মুক্ত আকাশে পরীর মতো করেই উড়তে চাই। আমার কাজ, আমার সন্তান, আমার পরিবার এবং আমার দর্শকদের ভালোবাসা নিয়েই আমি বাকি জীবন বাঁচতে চাই।’
এদিকে, ২০২১ সালের ৮ জুন ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন পরীমনি। তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ নাসিরসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। পরে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। পরীমনির আইনজীবীর তথ্য অনুযায়ী, মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, একই ঘটনার জেরে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই পরীমনির বিরুদ্ধে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ঢাকার আদালতে নালিশি মামলা করেন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তার অভিযোগ, বোট ক্লাবে অ্যালকোহল বিনামূল্যে দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরীমনি তাকে গালমন্দ করেন এবং গ্লাস ছুড়ে মারেন। সেই মামলাটিও বিচারাধীন।



