এফ আর খানের ৯৭তম জন্মদিনে স্মরণ: স্থাপত্যে আইনস্টাইনের অবদান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
বিশ্বখ্যাত স্থপতি ফজলুর রহমান খানের (এফ আর খান) ৯৭তম জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীতে একটি স্মরণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। শনিবার গুলশানের একটি হোটেলে ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি অব ফজলুর রহমান খান: আইনস্টাইন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন কোম্পানি বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেড (বিটিআই)।
শিক্ষাবিদের দীর্ঘ বক্তব্য: এফ আর খানের চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক
অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তব্যে এফ আর খানের জীবন ও কর্ম তুলে ধরেন শিক্ষাবিদ ও কাঠামো প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামীম জেড বসুনিয়া। তিনি বলেন, এফ আর খান শুধু একজন প্রকৌশলী নন, বরং বিশ্বনন্দিত এক মেধাবী চিন্তক; যিনি আধুনিক নগর স্থাপত্যের ধারা বদলে দিয়েছেন। তাঁর কাজের প্রভাব আজও বিশ্বের বিভিন্ন শহরের ‘স্কাইলাইনে’ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
অধ্যাপক বসুনিয়া আরও উল্লেখ করেন, সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজার প্রবণতা এফ আর খানের কাজের মূল শক্তি ছিল। তিনি বলেন, এফ আর খান বিশ্বাস করতেন, প্রতিকূলতার মধ্যেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপত্য ও প্রকৌশলের জটিল সমস্যাগুলো সমাধানে তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি ও নতুন প্রজন্মের আহ্বান
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি এফ আর খানের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এফ আর খানসহ দেশের কৃতী সন্তানদের মূল্যায়নে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অল্প কিছু ব্যক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সব অবদানকারীকে যথাযথ সম্মান জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্থপতি রফিক আজম এফ আর খানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের নকশায় বিপ্লব ঘটানো প্রখ্যাত প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খানের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে যথাযথ সম্মান জানাতে পারেনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফজলুর রহমান খানের উদ্ভাবিত ‘টিউবুলার স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ ছাড়া আজকের দিনের সুউচ্চ ভবন নির্মাণ প্রায় অসম্ভব হতো।
পরিবারের সদস্যের স্মৃতিচারণ ও অনুপ্রেরণা
বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফায়জুর রহমান খান তাঁর চাচা এফ আর খানকে নিয়ে স্মৃতি তুলে ধরেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, চাচা শুধু একজন প্রকৌশলী নন, বরং আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতার এক প্রতীক। তিনি বলেন, ‘চাচা কখনো ব্যর্থতাকে ভয় পাননি। শূন্য পাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। এই মানসিকতাই একজন মানুষকে বড় করে।’ পাশাপাশি এফ আর খানের জীবন ও কর্ম পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
এফ আর খানের জীবনী ও কৃতিত্ব
স্থপতি এফ আর খানের জন্ম বাংলাদেশের মাদারীপুরের শিবচরে, ১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল। ১৯৫২ সালে বৃত্তির সুবাদে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় থেকে এফ আর খান দুটি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি ও একটি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন মাত্র তিন বছরে।
তাঁর নকশা করা যুক্তরাষ্ট্রের সিয়ারস টাওয়ারই ছিল একসময় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন। ১১০তলা, ১ হাজার ৪৫৪ ফুট উঁচু এই ভবনই বিশ্বখ্যাতি এনে দেয় স্থপতি এফ আর খানকে। তিনি ১৯৮২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে মারা যান।
স্থপতি জান্নাত জুঁইয়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিটিআইয়ের চিফ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ইশতিয়াক হোসেন। এফ আর খান রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করতেন, তাঁর পছন্দের রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়েই শেষ হয় স্মরণ অনুষ্ঠানের।



