কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী পালতোলা নৌকা
কুড়িগ্রামে পালতোলা নৌকা বিলুপ্তির পথে

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে পালতোলা নৌকার বিলুপ্তি: লোকসংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকট

নদীবেষ্টিত উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের রৌমারী অঞ্চলে লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক পালতোলা নৌকা আজ বিলুপ্তির পথে। যান্ত্রিক নৌযানের ব্যাপক বিস্তার এবং নদ-নদীর ক্রমাগত নাব্যতা সংকটের কারণে একসময়কার প্রধান এই বাহনটি এখন প্রায় দেখা যায় না। এক সময় রংবেরঙের পাল খাটিয়ে কৃষিপণ্য ও নানা পসরা সাজিয়ে ভাটিয়ালির সুরে ভেসে বেড়াত সওদাগরি নৌকাগুলো। নতুন বধূর বাপের বাড়ি যাওয়া কিংবা এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে পারাপারের ক্ষেত্রে পালতোলা নৌকাই ছিল মানুষের একমাত্র ভরসা। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না বললেই চলে, যা স্থানীয়দের জন্য গভীর দুঃখের বিষয়।

স্থানীয় মাঝি ও বাসিন্দাদের বক্তব্য

স্থানীয় মাঝি আমিনুল ইসলাম জানান, নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল পালতোলা নৌকা। যাতায়াতের পাশাপাশি জেলেরা এসব নৌকায় নিয়মিত মাছ শিকার করতেন। তবে নদীতে পানি কমে যাওয়া ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে এখন খুব কমই দেখা যায় পালতোলা নৌকা। তিনি বলেন, "বর্তমানে আমি নিজের পালতোলা নৌকাটি দিয়ে বাড়ির গৃহপালিত পশু পরিবহন ও চরাঞ্চল থেকে ঘাস সংগ্রহের কাজ করি। মাঝে মধ্যে দর্শনার্থীদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ-এ ঘুরে বেড়াই, কিন্তু আগের মতো সেই চাহিদা নেই।" একসময় এই নদীর ঘাটগুলোতে সারি সারি পালতোলা নৌকা বাঁধা থাকলেও এখন সেগুলোর জায়গা দখল করেছে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা, যা ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ বলেন, "আগে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর পাড়ে পালতোলা নৌকায় মানুষ পারাপার হতেন এবং জেলেরা মাছ ধরতেন এসব নৌকায়। এখন সেই দৃশ্য কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আধুনিক যান্ত্রিক নৌযানের প্রভাবে এই ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে, যা স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য একটি বড় ক্ষতি।

ঐতিহ্য সংরক্ষণের আহ্বান

বন্দবেড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আব্দুল কাদের সরকার বলেন, "শৈশব থেকেই নদী ও নৌকা বাঙালির অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় পালতোলা নৌকাই ছিল যাতায়াত ও পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। বাতাসে পাল ওড়ার দৃশ্য আর সারি সারি নৌকার ছন্দোবদ্ধ চলা মানুষের মন ভরিয়ে দিত। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য এখন প্রায় বিলুপ্তির মুখোমুখি।" তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, পালতোলা নৌকা শুধু একটি বাহন নয়, এটি বাঙালির লোকসংস্কৃতি ও নদীনির্ভর জীবনের জীবন্ত প্রতীক।

স্থানীয়দের মতে, এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল গল্পেই শুনবে পালতোলা নৌকার কথা, বাস্তবে এর দেখা পাবে না। তারা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যাতে এই সাংস্কৃতিক সম্পদ টিকিয়ে রাখা যায়।