ট্রাম্পের 'স্টোন এজ' হুমকি: ইরান সভ্যতা ধ্বংসের অজ্ঞতা
ট্রাম্পের 'স্টোন এজ' হুমকি: ইরান সভ্যতা ধ্বংসের অজ্ঞতা

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি সভ্যতাকে চিরতরে মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন—এটি দেখে ওই রাতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি। ছবি: এআই জেনারেটেড। নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া বিল্ডিং ধসে যাওয়ার পরের দিন, অর্থাৎ ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকালে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই–এর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহমুদ আহমেদের অফিসের টেলিফোন বাজল। মাহমুদ আহমেদ ফোন ধরলেন। অপর প্রান্তে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজ। আর্মিটেজ হিমশীতল গলায় বললেন, ‘মিস্টার মাহমুদ, টুইন টাওয়ারে হামলার হোতারা আফগানিস্তানে আছে। তাদের ধরতে তোমরা যদি আমাদের সহযোগিতা করো তো ভালো, আর যদি না করো, তাহলে পুরো পাকিস্তানকে স্টোন এজ-এ পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ ওই সময়কার পাক-প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ২০০৬ সালে ছাপা হওয়া আত্মজীবনী ইন দ্য লাইন অব ফায়ার: আ মেমোয়ার-এ এভাবেই ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন।

ট্রাম্পের ‘স্টোন এজ’ হুমকি

সেই ঘটনার সিকি শতাব্দী পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে ‘স্টোন এজ’ শব্দবন্ধটি আবার শোনা গেল। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ মার্চ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার তিনদিন পর (১ এপ্রিল, ২০২৬) তিনি কথাটা বললেন। ওই দিন টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্প বললেন, ‘দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর কঠিন থেকে কঠিনতর আঘাত হানা হবে। ইরানকে স্টোন এজ-এ ফিরিয়ে নেওয়াই হবে সে হামলার লক্ষ্য।’ এরপর তুমুল যুদ্ধের মধ্যে ৭ এপ্রিল রাতে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ টুইট করলেন, ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতার মরণ হবে, আর কস্মিনকালেও তা ফিরে আসবে না।’ মানে, তিনি সরাসরি বলে দিলেন, ইরান এবং ইরানের নয় কোটি মানুষকে ‘আজ রাতেই’ মুছে ফেলা হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি সভ্যতাকে চিরতরে মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন—এটি দেখে ওই রাতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি। কারণ তারা জানে, এক রাতে একটি গোটা সভ্যতাকে হত্যা করতে গেলে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে হবে তা পরমাণু বোমার ব্যাবহার ছাড়া সম্ভব নয়; আর ট্রাম্প যে ধরনের লোক, তাতে তাঁর পক্ষে সে ধরনের কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা অসম্ভব কিছু না। তবে সভ্যতার কপাল ‘আপাতত ভালো’ যে ট্রাম্প সে সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

গোটা দেশ উড়িয়ে দেওয়া বা সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেওয়া কিংবা সভ্যতাকে প্রস্তরযুগে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা যে আমেরিকা নামক রাষ্ট্রটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে শুধু আর্মিটেজ বা ট্রাম্পই দিয়েছেন-এমন না। ১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকা যখন ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ চালিয়ে বোমাবৃষ্টি শুরু করে, সে সময় মার্কিন জেনারেল কার্টিস লেমে উত্তর ভিয়েতনামকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর ওই সময়কার কুখ্যাত উক্তিটি ছিল, ‘বম্ব দেম ব্যাক ইন টু দ্য স্টোন এজ’ (‘বোমা মেরে তাদের প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দাও’)। এই কথাটা পরে আমেরিকায় সামরিক বাগধারা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সর্বশেষ ঘটনায় ট্রাম্পের ‘গোটা সভ্যতা মেরে ফেলা’ বা ‘পুরো দেশ উড়িয়ে দেওয়া’র হুমকির বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। ভ্যাটিকানের পোপ লিওর মতো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে এক সময় কট্টরভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া টাকার কার্লসনের মতো ডানপন্থী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও ট্রাম্পের এই কথার সমালোচনা করেছেন।

পারস্য সভ্যতার গৌরব

‘ইরানকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে দেওয়া হবে’—কথাটির মধ্যে ট্রাম্পের আত্মম্ভরি যতটা না আছে, তার চেয়ে বেশি আছে অজ্ঞতা। আছে ইতিহাসের ব্যাপারে অজ্ঞতা, আছে ভৌগোলিক বাস্তবতার বিষয়ে মূর্খতা, আর আছে একটি দীর্ঘ সভ্যতার ধারাকে বুঝতে না পারার অক্ষমতা। রেকর্ডপত্র বলছে, ছোটবেলায় নিউইয়র্কের কিউ ফরেস্ট স্কুল থেকে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অভব্য আচরণের কারণে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাঁকে একটি সামরিক-ধাঁচের স্কুলে পাঠানো হয়। পরে সায়েন্স ইন ইকনোমিকস বিষয়ে তিনি কোনো রকমে স্নাতক ডিগ্রি পান।

তবে অর্থবিজ্ঞানের গড়পড়তা মানের ছাত্র হলেও ট্রাম্পের বিষয়বুদ্ধি বরাবরই টনটনা। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই পয়সা-কড়ির হিসাবের খাতায় বন্দী। রিয়েল এস্টেট আর ক্যাসিনো বা জুয়ার ব্যবসায় সফল হওয়া ট্রাম্পের কাছে এই পৃথিবী তাই হয়তো শুধুই বিষয়-সম্পত্তি আর লেনদেনের জায়গা। হয়তো সে কারণেই তিনি যে সহজ সত্যটি ধরতে পারেন না, তা হলো-আজকের ইরান (যার প্রাচীন নাম পারস্য) এমন এক সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে, যে সভ্যতা আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের জন্মের বহু আগেই সুসংগঠিত রূপ পেয়েছিল। পারস্য সভ্যতা যখন পূর্ণমাত্রায় বিকশিত, তখন ‘আমেরিকা’ নামের কোনো দেশ বা ভূখণ্ডের ধারণাও দুনিয়ার মাটিতে ছিল না।

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাস দ্য গ্রেটের নেতৃত্বে পারস্য এমন এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল যার আওতা ছিল মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। সেই সাম্রাজ্যে ছিল উন্নত প্রশাসন। ছিল করব্যবস্থা। ছিল সড়ক ও যোগাযোগের সুসংগঠিত কাঠামো। ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সিলিন্ডারের মতো দেখতে মাটি দিয়ে বানানো একটি বস্তু আছে। সেটির নাম ‘সাইরাস সিলিন্ডার’। তার ওপর আক্কাদীয় কিউনিফর্ম লিপিতে সম্রাট সাইরাসের ব্যাবিলন জয়ের কথা, পূর্ববর্তী শাসকের অত্যাচারের সমালোচনা, স্থানীয় মানুষের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শনের ঘোষণা, বিভিন্ন ধর্ম ও উপাসনালয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর কথা, নির্বাসিত জনগোষ্ঠীকে নিজ নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়ার অনুমতির কথা লেখা আছে।

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, শাসকের সহনশীলতা ও ন্যায্যতার ধারণা তুলে ধরা প্রাচীন পারস্যের এই সাইরাস সিলিন্ডারকে বিশ্বের প্রথম ‘মানবাধিকার ঘোষণার’ প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, প্রাচীন পারস্যের ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছিল আব্বাসীয় খেলাফতের সময়। ওই সময় খেলাফতের রাজধানী ছিল বাগদাদ, কিন্তু তার প্রাণস্পন্দন ছড়িয়ে ছিল পারস্যের নিশাপুর, রেই, মেরভ, বালখ্, তুস, ইসফাহানের মতো শহরগুলোতে। এই শহরগুলো জ্ঞান, সংস্কৃতি আর উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, যে সভ্যতার পীঠস্থানকে তিনি এক রাতে মেরে ফেলতে চেয়েছেন, সেখানে জন্ম নিয়েছেন ওমর খৈয়াম, আল-রাজি, ফেরদৌসির মতো মানুষ। তাঁরা কাব্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন ও গণিতের জগতে দিকপাল হয়ে আছেন। ট্রাম্প সম্ভবত জানেন না, ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক কেন্দ্র ‘বাইতুল হিকমা’ বা ‘জ্ঞানগৃহ’ ছিল একাধারে গ্রন্থাগার, অনুবাদ কেন্দ্র, গবেষণাগার ও একাডেমি যেখানে বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞান একত্রিত করে অধ্যায়ন ও উন্নয়ন করা হতো। এখান থেকেই গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় গ্রন্থের অনুবাদ হতো; এখান থেকেই গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, ভূগোল ইত্যাদিতে গবেষণা হতো; এখান থেকেই পণ্ডিতদের মধ্যে জ্ঞান-বিনিময় ও বিতর্ক হতো। এখান থেকেই ইউরোপের রেনেসাঁর ভিত তৈরি হয়েছিল; এখান থেকেই আল-খোয়ারিজমি বীজগণিতের ধারণা দেন যার ওপর আজকের অ্যালগরিদম দাঁড়িয়ে আছে।

যুদ্ধের ধ্বংসলীলা

ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনে (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবের শাহরাক-ই আল-মাহদি মহল্লার শাহজারেহ তাইয়েবেহ বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তাতে ১৫৬ জন বেসামরিক মানুষ মারা যায়। এদের মধ্যে ১২০ জনই ফুটফুটে বাচ্চা বয়সী ছাত্রী। ক্ষেপণাস্ত্রটি যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওই ভবনে আঘাত হেনেছে, তা নয়। সবাই এক রকম নিশ্চিত, খুব ঠান্ডা মাথায় হিসাব নিকাশ করে এই কন্যাশিশুদের সেদিন হত্যা করা হয়েছে। সামরিক স্থাপনার বাইরে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমায় ইরানের ১,৩০০টি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০ টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়েছে। তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শরিফ ইউনিভার্সিটি এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণাকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। পরীক্ষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসা অবকাঠামোও রক্ষা পায়নি। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা শতবর্ষী পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান-কেও টার্গেট করে হামলা হয়েছে।

ইরানে ২৯টি ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান আছে। এগুলো সময়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা এক দীর্ঘ সভ্যতার স্মৃতি। দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস জুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনাগুলো কখনো ছিল সাম্রাজ্যের রাজধানী, কখনো ইসলামি নগরজীবনের নিখুঁত নকশা, আবার কখনো মরুভূমির বুক চিরে ওঠা শহর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আগ্রাসন, রাজনৈতিক ঝড় আর শাসন পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও তারা টিকে আছে নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো। কিন্তু ইরান যুদ্ধের মুখে পড়ে সেই স্থিরতা আজ নাজুক হয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানে বিমান হামলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর একটি হলো গোলেস্তান প্যালেস, অপরটি তেহরান গ্র্যান্ড বাজার। গোলেস্তান প্যালেস শুধু একটি প্রাসাদ নয়-এ যেন ইতিহাসের নীরব দরবারঘর।

‘শ্বেতাঙ্গের দায়’ ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা

পশ্চিম যখন বিভিন্ন বনেদি সভ্যতার ওপর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এবং আফ্রিকা-এশিয়ার অশ্বেতাঙ্গদের বন্দুকের নলের মুখে শাসন করছিল, কৃষ্ণাঙ্গদের দাস বানাচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া কবি, গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক রুডিয়ার্ড কিপলিং ১৮৯৯ সালে একটি কবিতা লিখলেন। কবিতার নাম ‘দ্য হোয়াইট ম্যান’স বারডেন’ (‘শ্বেতাঙ্গের দায়’)। এই কবিতায় কিপলিং বললেন, ‘অসভ্য’ বা ‘পিছিয়ে থাকা’ জাতিগুলোকে সভ্য করা, শাসন করা এবং শোধন করা দরকার। আর এই নৈতিক ‘বারডেন’ বা ভার বা দায় শ্বেতাঙ্গদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। এই ‘দায়’ শোষণ নয়, এই দায় হলো এক ধরনের আত্মত্যাগ। এই কবিতায় কিপলিং উপনিবেশের শিকার জনগণকে অবলীলায় ‘হাফ ডেভিল অ্যান্ড হাফ চাইল্ড’ বা ‘আধা-শয়তান আর আধা-শিশু’ বললেন। অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের উপনিবেশের শিকার হওয়া অশ্বেতাঙ্গরা হলো একইসঙ্গে বিপজ্জনক এবং অপরিণত ও অক্ষম বললেন।

আজকের ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারীরা কিপলিংয়ের দর্শন ধারণ করে ‘শ্বেতাঙ্গদের দায়’ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এখন তাঁদের দায় ইরানকে ‘সভ্য’ করা, নয়তো পুরো পারস্য সভ্যতাকে মুছে ফেলা।

‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’

মনোবিজ্ঞানের ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ ধারণামতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজের পরিচয়, ইতিহাস বা মর্যাদা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভোগে, তাহলে তারা অতিরিক্ত ক্ষমতা খাটায়, আধিপত্য বা কঠোরতা দেখায়। আর এর মাধ্যমে তারা সেই ঘাটতি ‘পুষিয়ে’ নিতে চায়। যাদের দীর্ঘ প্রাচীন সভ্যতার ধারাবাহিকতা নেই, তারা নিজেদের বৈধতা তৈরি করে সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক আধিপত্য দিয়ে। এই কম্পেনসেটরি ডমিন্যান্স বা ভেতরের অনিশ্চয়তা ঢাকতে বাহ্যিক শক্তির অতিরিক্ত প্রদর্শন এক ধরনের রোগ। এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের কাছে সভ্যতা মানে ইতিহাস, শিল্প, দর্শন, জ্ঞান নয়। তাদের কাছে সভ্যতা মানে গায়ের জোর, সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি। পোস্ট-কলোনিয়াল থিউরি বলে, এ কারণেই পশ্চিমা বিশ্ব বাড়াবাড়িভাবে নিজেকে ‘আধুনিক’ এবং অন্যদের চেয়ে ‘শিক্ষিত’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছে।

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তাঁর ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বে বলেছিলেন-ভবিষ্যতের বিশ্বসংঘাত আর অর্থনৈতিক আদর্শের (যেমন সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ) মধ্যে হবে না; হবে বিভিন্ন ‘সভ্যতার’ মধ্যে; প্রধানত হবে পশ্চিমা বিশ্ব বনাম ইসলামি বিশ্বের মধ্যে। কিন্তু প্রাচ্যবাদী বুদ্ধিজীবী অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ এই ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, যে সংঘাত হবে সেটিকে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’ না বলে বরং ‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’ বা ‘অজ্ঞতার সংঘাত’ বলা উচিত হবে। ট্রাম্পের মূর্খতা আর অজ্ঞতা ভরা কথাবার্তা শুনে বোঝা যাচ্ছে, পূবালী সাঈদ কেন এই কথা বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুর ঠিক তিন মাস আগে ১৯৪১ সালের ৭ মে ‘সভ্যতার সংকট’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ওই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘“সিভিলিজেশন”, যাকে আমরা সভ্যতা নাম দিয়ে তর্জমা করেছি তার যথার্থ প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় পাওয়া সহজ নয়। এই সভ্যতার যে-রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার।’ ‘সদাচার’ মানে যে ‘সিভিলাইজেশন’ বা ‘সভ্যতা’, সে কথা গায়ের জোরকে সভ্যতা বলে প্রচার করা ট্রাম্পের না বোঝারই কথা। এ কারণেই তিনি এক রাতে গোটা পারস্য সভ্যতা মুছে দেওয়ার হুমকি দিতে পারেন। কারণ পারস্য সভ্যতার মূল্য তাঁর কাছে একেবারে অজানা।

তবে ওই প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দেখে এসেছি, পারস্যদেশ একদিন দুই যুরোপীয় জাতির জাঁতার চাপে যখন পিষ্ট হচ্ছিল তখন সেই নির্মম আক্রমণের যুরোপীয় দংষ্ট্রাঘাত থেকে আপনাকে মুক্ত করে কেমন করে এই নবজাগ্রত জাতি আত্মশক্তির পূর্ণতা সাধনে প্রবৃত্ত হয়েছে। দেখে এলেম, জরথুষ্ট্রিয়ানদের সঙ্গে মুসলমানদের এককালে যে সাংঘাতিক প্রতিযোগিতা ছিল বর্তমান সভ্যশাসনে তার সম্পূর্ণ উপশম হয়ে গিয়েছে। তার সৌভাগ্যের প্রধান কারণ এই যে, সে যুরোপীয় জাতির চক্রান্তজাল থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল।’ কিন্তু এইসব জ্ঞানের কথা কি কোনোদিন ট্রাম্পের কাছে পৌছাবে?