মারমা যুগলের বিয়েতে বর কনেকে আশীর্বাদ করছেন আগত অতিথিরা। ৮ মে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়িতে উৎসবের আমেজে বরের মা বাড়ির প্রবেশমুখে নববধূর অপেক্ষায় থাকেন। প্রবেশদ্বারে কলাগাছ ও ভরা কলস রাখা হয়। বরযাত্রী এলে মা তাঁর পুত্রবধূকে ডান হাতে মাঙ্গলিক সুতা পরিয়ে অন্দরমহলে নিয়ে যান। এ সময় মুহুর্মুহু করতালি ও ঢাকঢোলের বাজনায় বাড়ির প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে। মারমা সমাজে এভাবেই হয় বধূবরণ, যা বিয়েকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আস্থা ও বিশ্বাসের বন্ধনেরও সম্মতি এটি। দুই তরুণ-তরুণীর পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাসের বন্ধনে অভিভাবকের সম্মতি ও সমাজের স্বীকৃতিই যথেষ্ট। এটিই মারমাদের ঐতিহ্য, যেখানে লিখিত দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন নেই। বিবাহে উপস্থিত সমাজের প্রত্যেকে জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করে। তাই মারমা সমাজে বিবাহ নিবন্ধনের পদ্ধতি প্রয়োজন হয়ে ওঠেনি।
বিবাহের ধাপে ধাপে সামাজিক স্বীকৃতি
শুধু বধূবরণ নয়, মারমা সমাজে বিবাহের কয়েক ধাপে সামাজিক স্বীকৃতি নিতে হয়। বরযাত্রী কনের বাড়ি থেকে কনে নিয়ে পাড়া সীমানা পার হওয়ার আগেই পাড়ার তরুণ-তরুণীদের বাধার মুখে পড়ে। তারা জানতে চান, আপনারা কি বউ নিয়ে যাচ্ছেন? তখন বউ নিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ কিছু টাকা দিয়ে চলে যায় বরযাত্রীর দল। মারমা ভাষায় এটাকে ‘লেংখোয়াছিখ্রাং’ বলা হয়। এটি তরুণসমাজের স্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে দাম্পত্যজীবনে সমস্যা হলে ওই সব তরুণ-তরুণী সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন। এরপর বিবাহবন্ধনের মূল আনুষ্ঠানিকতায়ও স্বীকৃতি নেওয়া হয়। এভাবে বিশ্বাসের ঐতিহ্যে সমাজ প্রজন্ম পরম্পরায় চলছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে বিবাহ নিবন্ধন করার রীতি শিক্ষিত সমাজে প্রচলন হয়েছে।
লাকথেক মাংলা পোয়ে: জোড়াবন্ধনের মাঙ্গলিক উৎসব
বধূবরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিবাহবন্ধনের মূল আনুষ্ঠান জোড়াবন্ধনের মাঙ্গলিক উৎসব। মারমা ভাষায় এই উৎসবকে বলা হয় ‘লাকথেক মাংলা পোয়ে’। সেখানে বরের বাঁ পাশে কনেকে বসানো হয়। বর ও কনের সামনে পানিভর্তি পাত্রে জামগাছের একগুচ্ছ পাতা, শুভ্র মাঙ্গলিক সুতা, তুলাসহ আরও কিছু উপকরণে মঙ্গলঘট বসানো থাকে। একজন অভিজ্ঞ ‘উব্দিদে’ (বিপত্নীক নয় এমন ব্যক্তি) বিয়ে পড়ানোর কাজ করেন। তিনি বরের বাঁ হাতের ও কনের ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল মাঙ্গলিক সুতার বন্ধনে যুক্ত করেন। তারপর বিবাহ-মন্ত্রপাঠ করে জামের পাতায় মঙ্গলঘটের পানি বর-কনের ওপর সাতবার ছিটিয়ে বিয়ে পড়িয়ে দেন। মন্ত্রপাঠ শেষে বর ও কনে মালাবদল করেন এবং পরস্পরকে মিষ্টি অথবা ভাত খাইয়ে দেন। বিয়ে পড়ানো শেষে আমন্ত্রিত প্রত্যেকে বর–কনের হাতে মাঙ্গলিক সুতা পরিয়ে এবং মাথায় চাল ছিটিয়ে আশীর্বাদ করেন। বরের সঙ্গী ‘মতেছরা’ (মিতবর) ও কনের সঙ্গিনী ‘আখাছরা’ (মিতকনে) এ সময়ে সহযোগিতা করেন।
ঐতিহ্যে মোরগের ব্যবহার ও বর্তমান পরিবর্তন
ঐতিহ্য অনুযায়ী একসময় ‘লাকথেক মাংলা পোয়ে’ অনুষ্ঠানে মঙ্গলঘটের পাশে অর্ধসেদ্ধ একটি মোরগ রাখা হতো। বর ও কনের জন্য আমন্ত্রিতদের আশীর্বাদ ও মঙ্গল কামনা শেষে মোরগের ঠোঁটের জিবের অগ্রভাগের ত্রিকোণ আকৃতির অংশ পরীক্ষা করে নবদম্পতির দাম্পত্যজীবনের শুভাশুভ দেখা হতো। ওই মোরগের রান্না করা মাংস দিয়ে বর ও কনে পরস্পরকে ভাত খাইয়ে থাকেন। বর্তমানে এ রীতি প্রচলন কম দেখা যায়, বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজে দেখা যায় না। সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে এ রীতি দেখা যায়নি। মোরগ জবাইয়ের এ রীতির বিকল্প হিসেবে বর্তমানে অনেকে বৌদ্ধবিহারে গিয়ে বৌদ্ধভিক্ষুদের কাছে মঙ্গলসূত্র শুনে থাকেন।
মারমা বিবাহের প্রকারভেদ ও সমাজসিদ্ধতা
মংসানু চৌধুরী ও উ ক্য জেন মারমা লিখিত ‘মারমা ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ বইয়ে বলা হয়েছে, মারমা সমাজে সামাজিক বিয়ে (অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ) ও পালিয়ে বিয়ে (ইলোপমন্টে ম্যারেজ) দুই ধরনের বিবাহ হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে আদালতে বিয়েও হচ্ছে। তবে যেভাবে বিবাহ হোক, সামাজিক স্বীকৃতির জন্য ‘লাকথেক মাংলা পোয়ে’ অবশ্যই করতে হবে। না হলে বিবাহ সমাজসিদ্ধ হবে না। এই ঐতিহ্য এখনও মারমা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিশ্বাস ও আস্থার বন্ধনকে শক্তিশালী করে চলেছে।



