নতুন স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালো লাগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইফতেখার রাফসানের। অনলাইন দুনিয়ায় ‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’ নামে পরিচিত এই ইউটিউবার রাস্তায় দাঁড়ালেই ভিড় জমে যায়। বর্ণিল খাবারদাবার ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের ফটোশুট করতে গিয়ে কিছুক্ষণ আগেই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মিলেনিয়াল থেকে জেন-জি পার হয়ে আলফা প্রজন্মের কাছেও তিনি সমান জনপ্রিয়।
নার্ভাসনেস কাটিয়ে ভিডিও বানানো
আলাপের শুরুতেই রাফসান বলেন, ‘বাইরে গিয়ে ছবি তুলতে হবে, এটা ভাবলে এখন হার্ট ধুকধুক করে। ভিডিও করাও আগের চেয়ে অনেক কঠিন লাগে।’ খাবার নিয়ে দুই শতাধিক ভিডিও বানিয়েছেন, তবু নতুন ভিডিও বানাতে গেলে এখনো নার্ভাস থাকেন। খাবার নিয়ে ভ্লগ বানান বলে ক্যামেরার সামনে তো আসতেই হয়, কিন্তু এর বাইরে একটু আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন তিনি।
যাত্রা শুরু ‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’ হিসেবে
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম ভিডিও বানিয়েছিলেন, তখন অনেকেই সেটা নিয়ে হাসাহাসি করেছিল। কয়েক বছর তাই ওপথ মাড়াননি। পাঁচ বছর পর ‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’ নামে আবার শুরু করেন। বাড়ির ছোট ছেলে, তাই নামের শেষে জুড়ে দেন ‘দ্য ছোট ভাই’। তারপর ‘হ্যালো গাইজ, দিস ইজ রাফসান দ্য ছোট ভাই...’ কথাগুলো যেন একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছে।
রান্নার প্রতি আগ্রহ
খাবার নিয়ে এত ভ্লগ বানালেও রাফসান নিজেও রাঁধতে পারেন। তিনি জানান, রান্নার প্রতিও তাঁর আলাদা আগ্রহ আছে, বিশেষ করে কন্টিনেন্টাল খাবার। স্প্যাগেটি, পাস্তা, আইয়ো এ অলিও, পিৎজা, গার্লিক ব্রেড থেকে শুরু করে ব্রাউনি, কুকিজ—সবই বানাতে পারেন। নতুন স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালো লাগে, আর এই জায়গা থেকেই রান্নার প্রতি টানটা তৈরি হয়েছে। খাবারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘ফু ওয়াংয়ের বিফ শর্মা আমার খুব পছন্দ।’ ঢাকায় খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটার একটা নিয়ন্ত্রণ দরকার।’
ভাতের প্রতি ভালোবাসা
সারা দিন বাইরে ঘুরে ঘুরে খেলেও বাড়ির খাবারই তাঁর কাছে প্রিয়। রাফসান ভাতপাগল মানুষ। দিনে পাঁচ বেলা ভাত খেতেন একসময়, তখন ওজন ছিল ১২০-১২৫ কেজি। এখনো খান, তবে কিছুটা কমিয়েছেন। ভাতের প্রতি এতটাই আসক্তি যে একবার বিদেশ সফর ছোট করে দেশে চলে এসেছিলেন ভাত খাওয়ার জন্য। গল্পচ্ছলে জানান, ‘দুবাই হয়ে টার্কিতে আমার একটা ট্যুর ছিল। হঠাৎ বাড়ির কথা মনে পড়ল, আর মনে হলো ভাত খেতে হবে। আমাদের স্টাইলের ভাত। আর এ কারণেই দুই দিন আগে বাড়ি চলে এসেছিলাম।’
টিম ও ভ্রমণ
খাবার ছাড়াও এখন নানা ধরনের ভিডিও কনটেন্ট বানাচ্ছেন রাফসান। পর্দায় একজন মানুষ দেখা গেলেও এর পেছনে পুরো একটি টিম কাজ করে। দলে বর্তমানে ৯ জন সদস্য আছেন। ব্যবহার করেন দুটি ক্যামেরা, একাধিক ফোন ও গো প্রো। দেশের বাইরে গিয়েও নিয়মিত ভিডিও বানান তিনি। কয়েক দিন আগে ঘুরে এলেন পাকিস্তান। এর আগে গেছেন জাপান, দুবাই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশে। বিদেশের মাটিতে করা ভিডিও আপলোডের পর সেখানকার দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। কমেন্টে অনেকের ভালো কথা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।
রেস্তোরাঁ থেকে টাকা নেওয়া প্রসঙ্গ
‘রাফসান কি রেস্তোরাঁ থেকে টাকা নিয়ে ভিডিও বানান?’—এমন প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়। প্রশ্ন করতেই ইফতেখার রাফসান হেসে বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা ধারণা আছে, কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভিডিও করা মানে মালিকপক্ষ টাকা দিয়েছে। অথচ আমি যে রেস্তোরাঁয়ই যাই না কেন, আগে থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ করি না, সরাসরি অভিজ্ঞতা নেওয়ার চেষ্টা করি।’
ভিডিও পরিকল্পনা ও সামাজিক বার্তা
ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা করে রাখেন রাফসান। ‘ডেটা অ্যানালাইসিস করি। জানি ভিডিওর শুরুটা কেমন হলে দর্শক শেষ পর্যন্ত দেখবে। ইউটিউবার মি. বিস্টের ভিডিও দেখলে বুঝবেন, তিনি মাঝখান থেকে ভিডিও ব্রেক করে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখেন।’ রাফসানের লক্ষ্য থাকে নিজস্বতা ও সততা। ভিডিওর শেষে একটি সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন সব সময়। সচেতনভাবেই তিনি তা করেন: ‘মনে করি, শুধু বিনোদন নয়, একটা বার্তাও থাকা উচিত।’ যাঁরা তাঁর ফলোয়ার, তাঁরা জানেন গেমিংয়ে রাফসানের প্রবল আগ্রহ। আগে নিয়মিত ‘কাউন্টার-স্ট্রাইক: গ্লোবাল অফেনসিভ’ খেলতেন, পরে ‘ভ্যালোরেন্ট’-এ অংশ নেন।
ঈদের দিনের রুটিন
ঈদের দিন রাফসানের প্রথম পছন্দ মায়ের হাতে রান্না করা খাবার। তিনি বলেন, ‘মায়ের হাতের রান্নার ওপর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আম্মু রান্না করে, সেই খাবারই সাধারণত খাই। মায়ের হাতে তেহারি ভালো লাগে। মা বেস্ট তেহারি বানায়। আপনারা যদি কখনো খান, তাহলে বুঝবেন।’
ঈদে বাইরেও খেতে যান তিনি, ‘ওটা মনে হয় আমার চোখের খিদা। বাসায় যখন খাই, তখন মনে হয় পেট আর মন দুটো ভরেই খেলাম।’ ঈদের দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ হলো সবার সঙ্গে বসে খাওয়ার সময়। ছোটবেলায় একসঙ্গে খাওয়া তাঁকে তেমন টানত না, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব বুঝেছেন। এখন এই সময়টাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন।
সকালে নামাজ শেষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। বিকেল, সন্ধ্যা বা রাতে বের হন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা ও আড্ডায়। ঈদের দিনেও গেম খেলা মিস করেন না। হাসতে হাসতে বলেন, ‘তারপর আবার ফিরে এসে গেম খেলি।’
ঈদের আগের রাতে সময়ের হিসাব থাকে না। রাত তিন-চারটা পর্যন্ত গেম খেলেন, তারপর খুব অল্প সময়ের জন্য ঘুম। মাত্র তিন ঘণ্টা পরই আবার উঠতে হয়—ঈদের সকাল তো আর মিস করা যাবে না।



