সিডনিতে বাংলা সিনেমার জোয়ার: প্রবাসীদের ভিড়ে প্রেক্ষাগৃহে উৎসবের আমেজ
সিডনিতে বাংলা সিনেমার জোয়ার, প্রবাসীদের ভিড়ে উৎসব

সিডনির প্রেক্ষাগৃহে বাংলা সিনেমার উৎসব: প্রবাসীদের ভিড়ে জমজমাট পরিবেশ

বিগত কয়েক দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের মাল্টিপ্লেক্সগুলোর চিত্র পাল্টে গেছে। গতানুগতিক হলিউড সিনেমার পোস্টারের মাঝে এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান বাংলা চলচ্চিত্রের ব্যানার। ছুটির দিনগুলোতে প্রেক্ষাগৃহের লবিতে প্রবেশ করলেই কানে ভেসে আসে বাংলা কথোপকথন আর প্রাণখোলা আড্ডার শব্দ। দেখা যাচ্ছে, দল বেঁধে প্রবাসীরা আসছেন সিনেমা দেখতে; কেউ পরিবার নিয়ে, কেউবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে মিলে। সিনেমার বিরতিতে বা শো শেষে হলের সামনে দাঁড়িয়ে দলবদ্ধভাবে সেলফি তোলা কিংবা চলচ্চিত্র নিয়ে তপ্ত আলোচনায় মেতে ওঠা—সব মিলিয়ে সিডনি এখন যেন ঢাকার এক টুকরো বাংলা মাল্টিপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে।

প্রবাসের ব্যস্ততা পিছনে ফেলে বাংলা সিনেমার জয়যাত্রা

প্রবাসের যান্ত্রিক ব্যস্ততা ও দৈনন্দিন জীবনের চাপকে ঠেলে দিয়ে সিডনির বড় বড় প্রেক্ষাগৃহে বইছে বাংলা চলচ্চিত্রের উৎসবী হাওয়া। একই সময়ে তিনটি ভিন্ন মেজাজের ছবি—‘দম’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এবং ‘প্রেশার কুকার’ সিডনির দর্শকদের আবেগ ও ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করছে যে, ভালো গল্পের টানে সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরেও বাংলা সিনেমার জয়গান গাওয়া সম্ভব। এই সাফল্য শুধু সিডনিতেই সীমাবদ্ধ নয়, মেলবোর্ন, অ্যাডিলেড, ব্রিসবেন ও ক্যানবেরার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহেও সিনেমাগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে, যা বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘দম’: হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া এক গভীর অভিজ্ঞতা

রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘দম’ চলচ্চিত্রটি সিডনির দর্শকদের মাঝে এক গভীর দাগ কেটেছে। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই ছবি দর্শকদের এতটাই আপ্লুত করেছে যে সিনেমা শেষ হওয়ার পরেও অনেককে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হওয়া দর্শক চিকিৎসক মাহবুবা খানম তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘পুরো সিনেমাটি আমি ঝাপসা চোখে দেখেছি। এটি আমার হৃদয়ের সমস্ত দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এমন কাজ কেবল জাতীয় পুরস্কার নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি রাখে। আমার হাতে থাকলে আমি একে সরাসরি অস্কারে পাঠিয়ে দিতাম!’ এই ধরনের আবেগময় প্রতিক্রিয়া ছবির শক্তিশালী গল্প ও অভিনয়ের প্রতি দর্শকদের গভীর সংযোগেরই ইঙ্গিত দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘বনলতা এক্সপ্রেস’: নস্টালজিয়া ও ভালোবাসার এক মোহনীয় ফিউশন

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত এবং তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দর্শকদের নিয়ে গেছে নব্বইয়ের দশকের সেই সোনালি স্মৃতিতে। ছবিতে চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিমের অভিনয় আবারও দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। সাবিলা নূর, শরীফুল রাজ, বাঁধন, মম এবং শামীমা নাজনীনের প্রতিটি চরিত্রই ছিল জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। দর্শকদের মতে, নির্মাতা তানিম নূর যেন আধুনিক মোড়কে হুমায়ূন আহমেদের সেই চিরচেনা জাদুকরি স্বাদটিই ফিরিয়ে দিয়েছেন। নুহাশ হুমায়ূনের কণ্ঠে ছবির বর্ণনা যেন দর্শকদের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করেছে, যা ছবিটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।

‘প্রেশার কুকার’: জীবনের জটিল সমীকরণের এক মর্মস্পর্শী চিত্রায়ন

‘প্রেশার কুকার’ ছবিটিও দর্শকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। আধুনিক জীবনের চাপ এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে নির্মিত এই ছবি দর্শকদের যেমন হাসিয়েছে, তেমনি ভাবিয়েছেও। সিনেমাটির অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশক পথ প্রোডাকশনস-এর অন্যতম প্রধান ফয়সাল হোসেন বলেন, ‘এটি একটি জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র। পরিবার ও কষ্টের বিষয়গুলো যেভাবে এখানে উঠে এসেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আশা করছি দর্শক ছবিটিকে অনেক দিন মনে রাখবেন।’ এই মন্তব্য ছবির বাস্তবতা ও মানবিক আবেদনের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা প্রবাসী দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছে।

পরিবেশকদের চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের গল্প

‘দম’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর অস্ট্রেলিয়ায় পরিবেশনার দায়িত্বে রয়েছে বঙ্গজ ফিল্মস। সিনেমাগুলো নিয়ে পরিবেশক তানিম মান্নান বলেন, ‘দম ও বনলতা এক্সপ্রেস-এর মতো ছবিগুলো সিডনিতে নিয়ে আসা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু দর্শকদের অভাবনীয় সাড়া আমাদের সব কষ্ট সার্থক করে দিয়েছে। সিডনির প্রতিটি হল এখন কানায় কানায় পূর্ণ। আমরা চেষ্টা করছি সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরেও নিয়মিত মানসম্মত বাংলা সিনেমা পৌঁছে দিতে।’ এই প্রচেষ্টা বাংলা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সিডনির এই ঘটনা শুধু একটি সাময়িক উৎসব নয়, বরং বাংলা সিনেমার বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংযোগ ও আবেগের টান এই সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে আরও বেশি বাংলা চলচ্চিত্রের প্রদর্শনের দিকে ইঙ্গিত করে।