দিব্যা ভারতীর না বলা কষ্ট: মাস্টার রাজুর সাক্ষাৎকারে উঠে এলো মানসিক যন্ত্রণার গল্প
বলিউড ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনা হলো দিব্যা ভারতীর জীবনাবসান। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ৫ এপ্রিল ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ের নিজ অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারিভাবে এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত করা হলেও, দশকের পর দশক ধরে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সম্প্রতি শিশুশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় মাস্টার রাজু এক সাক্ষাৎকারে দিব্যা ভারতীর জীবনের সেই না-বলা অধ্যায়গুলোর কথা তুলে ধরেছেন, যা এই তারকার মানসিক সংগ্রামের চিত্র স্পষ্ট করে তোলে।
খ্যাতির শিখরে একাকিত্ব: 'ব্যবহৃত' বোধ করতেন দিব্যা
মাস্টার রাজুর বক্তব্য অনুযায়ী, দিব্যা ভারতী খ্যাতির চূড়ায় থাকা সত্ত্বেও ছিলেন গভীরভাবে 'অসুখী ও দুঃখী'। তিনি বলেন, 'দিব্যা আমাকে অনেক কিছু বলেছিল। সে ভীষণ একা আর দুঃখী ছিল। ক্যারিয়ার নিয়ে সে খুব খুশি ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো নিয়ে নয়। সে নিজেকে ব্যবহৃত মনে করত। তার মনে হতো, সে যেহেতু কাজ করছে আর টাকা উপার্জন করছে, তাই মানুষ তার টাকাপয়সার অপব্যবহার করছে। এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।'
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, অল্প বয়সে পাওয়া বিপুল সাফল্য ও অর্থের সঙ্গে সঙ্গে দিব্যার জীবনে ঢুকে পড়েছিলেন এমন কিছু মানুষ, যাঁরা তাঁর সরলতা ও সাফল্যকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছিলেন। নব্বইয়ের দশকে যখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, তখন দিব্যার মতো এক কিশোরীর জন্য এই চাপ সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তিন বছরে ২২টি ছবি: শ্রীদেবীর উত্তরসূরি হিসেবে খ্যাতি
দিব্যা ভারতীর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে তামিল ছবি 'নীলা পেন্নে' দিয়ে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করে তিন বছরের মধ্যেই তিনি ২২টি ছবিতে অভিনয় করেন, যা বলিউড ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি, ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক অভিনয় আর তরুণ বয়সের উচ্ছ্বাস তাকে দর্শকের প্রিয় মুখে পরিণত করে।
তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে অনেকেই তাঁকে শ্রীদেবীর উত্তরসূরি বা 'ইয়াং শ্রীদেবী' বলে আখ্যা দিতে শুরু করেন। মাস্টার রাজু বলেন, 'মানুষ তাকে শ্রীদেবীর বিকল্প, ইয়াং শ্রীদেবী বলত। তার ক্যারিয়ার ছিল অসম্ভব সম্ভাবনাময়। তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।'
মাস্টার রাজুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব: ডিস্কো ও বারে সময় কাটাতেন
মাস্টার রাজু সাক্ষাৎকারে দিব্যা ভারতীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দিব্যা ভারতী আর পূজা ভাট—এই দুই নায়িকার সঙ্গেই আমি খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। দিব্যার সঙ্গে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি; আমরা একসঙ্গে ডিস্কো আর বারে যেতাম। সালমান খানের মতো দিব্যাও ছিল আমার খুব কাছের বন্ধু। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম।'
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, দিব্যা শুধু সহশিল্পী নন, রাজুর কাছে ছিলেন একান্ত বন্ধু। তাঁদের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত ও আন্তরিক, যা দিব্যার জীবনের সামাজিক দিকটি তুলে ধরে।
সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক: জীবনের একমাত্র স্থিতিশীল দিক
ব্যক্তিগত জীবনের অনেক জটিলতার মধ্যেও দিব্যা ভারতীর জীবনে একটি আশাব্যঞ্জক দিক ছিল তাঁর স্বামী, প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক। মাস্টার রাজু বলেন, 'তার জীবনে যে মানুষ ছিল, তার ব্যাপারে সে খুবই ইতিবাচক ছিল। সে সন্তুষ্ট ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিল। ওই দিকটা তার জীবনে ঠিকই ছিল।'
এই সম্পর্কেই দিব্যা কিছুটা মানসিক স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়, যা তাঁর জীবনের অন্যান্য টানাপোড়েনের মধ্যে একটি ইতিবাচক উপাদান হিসেবে কাজ করছিল।
৫ এপ্রিল ১৯৯৩: রহস্যময় মৃত্যু ও না-শেষ হওয়া প্রশ্ন
দিব্যা ভারতীর মৃত্যু বলিউড ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারিভাবে দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত করা হলেও, সেই সময় থেকেই নানা গুঞ্জন ও প্রশ্ন চলছে। প্রযোজক পহলাজ নিহালানি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'তিনি তখন একেবারে একা ছিলেন। তখনো কেউ আসেনি। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি হাসপাতালে ছুটে যাই।'
মাস্টার রাজু সেই রাতের স্মৃতি শেয়ার করে বলেন, 'যখন সে মারা গেল, আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। আমি প্রথম ব্যক্তি ছিলাম যে সেখানে পৌঁছাই, আর শেষ ব্যক্তি ছিলাম যে সেখান থেকে বের হই। এটা ছিল ভয়ংকর। এটা হওয়া উচিত ছিল না।'
উত্তরাধিকার: স্মৃতিতে বেঁচে থাকা এক তারকা
মাত্র ১৯ বছর বয়সে দিব্যা ভারতীর জীবন থেমে গেলেও, তাঁর স্মৃতি আজও বেঁচে আছে দর্শক ও অনুরাগীদের মনে। নব্বইয়ের দশকের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে দিব্যা মানেই উচ্ছ্বাস, রোমান্টিকতা আর এক অসমাপ্ত সম্ভাবনার গল্প। তাঁর মৃত্যু শুধু এক তারকার জীবনাবসান নয়, বরং এক সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের আকস্মিক ইতি এবং এক তরুণীর না-বলা কষ্টের শেষ অধ্যায়।
মাস্টার রাজুর এই সাক্ষাৎকার দিব্যা ভারতীর জীবনের সেই অন্ধকার দিকগুলোকে আলোতে আনে, যা আজকের যুগে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রেক্ষিতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বলিউডের উজ্জ্বল তারকা খ্যাতির আড়ালে কী ধরনের মানসিক সংগ্রাম লড়তে হয়, দিব্যা ভারতীর গল্প তারই একটি মর্মস্পর্শী দলিল।
