রোববার সকাল সাড়ে আটটায় রাজধানীর বিজয় সরণি মোড় এলাকায় রাস্তায় পানি জমে গিয়েছিল। অফিস দশটায়, বাসা থেকে নয়টায় বেরোতে গিয়ে দেখা যায়, আকাশ ভাঙা বৃষ্টি হচ্ছে। নষ্ট গাড়ি গ্যারাজে ঘুমাচ্ছে, অন্য যানে যেতে হবে। বাসে উঠতে পারব না, উঠলেও উঠব না। অধমের অভিজ্ঞতা বলে, এই বর্ষণে বাসে উঠলে সেটা হিঁচড়ে হিঁচড়ে এক ঘণ্টায় মালিবাগ যাবে। সেখানে এখন ‘কুল নাই কিনার নাই’ টাইপের অথই ‘সাগর’। সেই সাগরে ‘লাব্বাইক পরিবহন’ নূহের কিস্তি হয়ে কত ঘণ্টা ভাসবে আল্লাহ মালুম। সিএনজির ‘বুক সমান’ পানি। মতিঝিল, বিজয় নগর, খিলগাঁও, মালিবাগ, মগবাজারের থই থই পানি তাকে আগেই বলে দিয়েছে, ‘এদিকে বড়দের ব্যাপার। এদিকে আসিস না।’
উবার নেই, পদব্রজে যাত্রা
সবকিছু ডুবার পরও উবার আছে ভেবে স্মার্টফোন হাতে নিলাম। দেখি সেখানেও ফাঁকা। কাছাকাছি তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গাড়ি নেই। তাহলে? পদব্রজেই হোক দুর্মর যাত্রা! বউ বলল, ‘ওরে, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে!’ দুই শিশুপুত্র রবিঠাকুরের ‘চারি বৎসরের কন্যাটির মতো’ ‘এতক্ষণ ছায়াপ্রায় ফিরিতেছিল মোর কাছে কাছে ঘেঁষে/চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্নিমেষে বিদায়ের আয়োজন।’ এই প্রবল ধারা দেখে তারাও অব্যক্ত ভাষায়, ‘কহিল বিষণ্ন-নয়ন ম্লান মুখে, “যেতে আমি দিব না তোমায়।”’ তবু যেতে দিতে হলো।
রিকশাও ফেল করল
রাস্তায় নামলাম। সেকি বৃষ্টি! ছাতায় বড়জোর মাথা বাঁচানো যাবে। যে রিকশার দিকে চাই, সে-ই এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ে। অনেকক্ষণ পর এক রিকশা পেলাম। ব্যাটারিচালিত। কোমর পানির দরিয়া পার হতে গিয়ে ইঞ্জিন ফেল করল। ধরলাম হাঁটা। লাজলজ্জার মাথা খেয়ে প্যান্ট তো আগেই গুটিয়েছি। ‘ডু ইন রোম অ্যাজ রোমানস ডু’।
হাঁটার জায়গা মানে ফুটপাতে এখন কাদা আর কাদা। কারণ সিটি করপোরেশনের কাজ চলছে। অসহায় ক্রোধে মন তেতে উঠল। মনে মনে বৃষ্টিকে বললাম, ‘হা রে হতভাগা! সিটি করপোরেশন যে প্রতিবছর এই ভর শ্রাবণে রাস্তা খুঁড়ে খুঁড়ে এডিপির বরাদ্দ বের করে আনে তা তুই জানিস না! বয়েস কি তোর সিটি করপোরেশনের চেয়ে কম? নামতে হয় তো পৌষ-মাঘ দেখে নাম না! তোকে মানা করছে কে?’
‘উন্নয়নকাজ চলিতেছে! সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত!’
সামনে যতই এগোচ্ছি ততই চোখে পড়ছে, ‘উন্নয়নকাজ চলিতেছে! সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত!’ বুঝলাম কথাটা আমাকেই বলা হচ্ছে। নিজেকে বড় কেউকেটা মনে হলো। করপোরেশন আমার কাছে দুঃখপ্রকাশ করছে! আহারে! আব্বা যদি বেঁচে থাকত। লোকটা দেখে যেতে পারত তাঁর ছেলের কী হ্যাডম!
অল্প কিছু পথ পেরোতেই চামড়ার স্যান্ডেল ফুলে ঢোল। না এটা পায়ে দিয়ে হাঁটতে পারছি, না হাতে নিয়ে চলতে পারছি। এর মধ্য দিয়েই মনে হলো—এই পথে ‘ছেঁড়া ছাতা-রাজছত্র মিলে চলে গেছে’ সোজা কারওয়ান বাজারের দিকে। বৃষ্টি প্লাবিত সেই পথে কী নেই? ‘আমের খোসা ও আঁটি, কাঁঠালের ভূতি, মাছের কানকা, মরা বেড়ালের ছানা, ছাইপাঁশ আরও কত কী যে!’ কোথাও কোথাও বেহুলার ভেলার মতো ভেসে যাচ্ছে মানুষের পাকস্থলিজাত সেই আদি ও অকৃত্রিম জিনিস। এর মধ্যেই মনে আসছে, ‘ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি, এক জলে সকলে শুচি’ টাইপের সাম্যবাদী সংগীত।
মৌচাকে পৌঁছে বৃষ্টির তাণ্ডব
রবীন্দ্র-লালন করতে করতে আর ফাঁকে ফাঁকে নিজের বাপের নাম মনে আছে কি না, তা খেয়াল রাখতে রাখতে মৌচাকে পৌঁছালাম। বৃষ্টি নামল আরও জোরে। আকাশ সহস্রলোচনা হয়ে উঠল। তার হাজার চোখ বেয়ে নামল প্রবল অশ্রুধারা। ঘরের মধ্যে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখে যে কেউ কালিদাস হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভেজা গা নিয়ে ছাতা হাতে উড়ালসেতুর খুঁটির তলে দাঁড়ালে নিজেকে সত্যজিতের ‘পরশপাথর’ ছবির কেরানি পরেশ চন্দ্র দত্ত ভাবা ছাড়া আর কী পথ থাকতে পারে।
জানি, আদ্যিকালের কালিদাস থেকে হালের আজিজ মার্কেটীয় হরিদাস পাল—যার মনে কাব্য ভাব এসেছে, বৃষ্টি তাকে ছাড়েনি। দুলাইন লিখিয়ে ছেড়েছে। উদীয়মান থেকে উদিত; শিক্ষানবিশ থেকে অবসরপ্রাপ্ত—সব কবি, সব সাহিত্যিকের বৃষ্টিদুর্বলতা ছিল, আছে, থাকবে।
প্রত্যেক মানুষই কবি
শুধু কি কবি? শুধু কি সাহিত্যিক? না। মানুষমাত্রই বৃষ্টিবিলাসী। মানুষমাত্রই কবি। চাই সে লিখুক বা না লিখুক। কারণ প্রতিটি মানুষ কবি। প্রতিটি কৃষক কবি। বৃষ্টি সবাইকে দোলা দেয়। যে লোক ‘মেঘদূতম’ বোঝে না; যে লোক ভানু সিংহের ‘শাঙ্গন গগনে ঘোর ঘনঘটা’—টাইপের পদাবলি বোঝে না; সে অন্তত এইটুকু বোঝে, আজ ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ জমবে। মাংস হলে আরেকটু ভালো হয়।
যে লোক তার সন্তানদের কাদাপানি থেকে সাবধানে সরিয়ে রাখে, বর্ষণের অবিমিশ্র আতিশয্য তাঁকেও রোমান্টিক করে তুলতে পারে। বাচ্চাদের হাত ছেড়ে দিয়ে তিনিও বলে উঠতে পারেন, ‘যা, ভেজ। ইচ্ছেমতো ভেজ। জ্বর বাধলে বাধুক!’
বৃষ্টি যখন কবিকে কেরানি বানায়
বৃষ্টি নিয়ে আদিখ্যেতা করা এই লোকই যখন ‘বিষ্ঠামুখর’ বন্যাকবলিত রাস্তা ধরে অফিসে যায় বা অফিস থেকে ফেরে; এই লোকেরই যখন ধান-পান-সবজির খেত কিংবা মাছের ঘের তলিয়ে যায়; দোকানপাট বন্ধ হয়ে ব্যবসা লাটে ওঠে, তখন সে আবার কবি থেকে কেরানি-খামারি-কৃষক-দোকানদার হয়ে যায়। আমার পরিচিত এক অবসরপ্রাপ্ত কবি আছেন, যিনি বাথরুমে যাওয়ার আগে আধা কাপ চা খান। এতে কোষ্ঠ সাফের ব্যাপারটা মসৃণ হয়। কিন্তু কোনো দিন যদি তিনি পুরো এক মগ চা খেয়ে বসেন, সেদিন তাঁর বাথরুম বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টিও তা-ই। সহনীয় মাত্রায় নামলে কেরানি হয়ে ওঠে কবি। বৃষ্টির দাপট বাড়লে কবি হয়ে যায় আটপৌরে সংক্ষুব্ধ করুণ কেরানি।
বর্ষণে আটকা পড়া ‘পরশপাথর’-এর কেরানি পরেশ মাথা বাঁচাতে আমার মতোই একটা দেয়ালের পাশে বসে পড়েছিল। সেখানে সে ঘুমে ঢলে পড়েছিল। তার তন্দ্রায় এসেছিল স্বপ্ন। স্বপ্নে সে পেয়েছিল পরশপাথর। সেই পাথর লোহায় ছোঁয়ালে লোহা পকাৎ করে সোনা হয়ে যায়। সোনা বেচে কেরানি পরেশ দত্ত হয়ে গিয়েছিল মিস্টার পরেশ ডাট। স্বপ্নে তার কত রকমের ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল। শেষে ঘুম ভেঙেছিল। স্বপ্নভঙ্গের পর মিস্টার পরেশ ডাট আবার কেরানি পরেশ দত্ততে ফেরত এসেছিল।
হাজার হাজার কেরানি পরেশ দত্ত
আজ এই বাদলায় এই ‘ঘনঘোর বরিষায়’ মনে হচ্ছিল ঢাকার রাস্তায় ছাতা হাতে হাজার হাজার কেরানি পরেশ দত্ত ছুটছে। কাকভেজা হয়ে তারা অফিসে ঢুকছে। কেউ আটকা পড়ছে। যারা পথে আটকা পড়ে আছে, তারা হয়তো স্বপ্ন দেখছে। পরশপাথরের স্বপ্ন। দারিদ্র্যমুক্ত করপোরেট স্বপ্ন। মধ্যবিত্তের বৃষ্টিস্নাত এই স্বপ্নে দোষ নেই। এ তো জীবনযন্ত্রণা থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও মুক্তি। আফিমে ব্যথা সারে না, কিন্তু ব্যথার অনুভূতি তো নষ্ট করে! সেটাই বা কম কী!
মৌচাক মোড় থেকে আসল যাত্রা
২. মৌচাক মোড় থেকে আসল যাত্রা শুরু হলো। যে রাস্তা দিয়ে আমাকে যেতে হবে, সেটি এখন দামোদর। এবার আমার বিদ্যাসাগর হয়ে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। লুঙ্গি পরে এলেও কাজ হতো না। পুরো রাস্তায় কোমরপানি। আমি গাইলাম, ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওহে দয়াময়...’। দয়াময় আধঘণ্টা পর ভ্যানওয়ালাকে পাঠালেন। ভ্যানে চড়ে বসলাম। ‘চারিদিকে বাকা জল করিছে খেলা।’
মনে হলো এমন সুযোগ আর কি পাব? পকেটে ছিল স্মার্টফোন। ভিডিও করা শুরু করলাম। ছবির গুণগত মান ঠিক রাখতে ক্যামেরার দিকে চোখ রাখায় খেয়াল ছিল না। পরে দেখি দুপাশের লোক সমানে গালি দিচ্ছে। ‘মাইনসে বাঁচে না, আর উনি জমিদার আইছে ভিডু করতে!’ আমি তাঁদের কী বলব? কীই-বা বলার আছে। মনে মনে শুধু বললাম, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়।’ এই ‘তারে’ মানে ‘কারে’? সে কি আমার বউ? নাকি আমাদের মেয়র মহোদয়? এবার মাথায় বাজল গোলাম আলীর বাংলা গজল, ‘কারে কারে বলি আমি!’
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক। ইমেইল: [email protected]



