পূর্ণিমা থেকে তুষি: কেন ঢালিউডে সুপারস্টার অভিনেত্রী তৈরি হচ্ছে না?
পূর্ণিমা থেকে তুষি: কেন ঢালিউডে সুপারস্টার তৈরি হচ্ছে না?

অমাবস্যার পর পূর্ণিমার আবির্ভাব

১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি। ঢালিউডে তখন ঘনঘোর অমাবস্যা। ঋতুপর্ণার 'স্বামী কেন আসামী', মুনমুনের 'টারজান কন্যা' আর পপির 'কুলি' সুপারহিট হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠিত নায়িকারা চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন। সালমানের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন শাবনূর, বিয়ের মালা গলায় পড়ে ফেঁসে গেছেন মৌসুমী। শাবনাজ দৃশ্যপটে নেই বললেই চলে। দিতি আর চম্পার 'শ্যাম রাখি না কূল রাখি' অবস্থা। নতুনদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাপড় খুলবেন, নাকি শাবানা-ববিতার মতো মাথায় ঘোমটা তুলবেন—এই ভেবে তাদের রাতের ঘুম হারাম। ঠিক তখনই চিত্রাকাশ ভরে যায় পূর্ণিমার আলোয়।

সালমান আচমকা চলে যাওয়ায় ঢালিউডে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। নির্মাতারা দিকশূন্য হয়ে পড়েন। দর্শকের নাড়ী বুঝতে তারা হিমশিম খান। মুম্বাই-কলকাতা থেকে আমদানি করা হয় নায়িকা। তারা স্বল্প পোশাকে দর্শকের বিনোদনতৃষ্ণা মেটাবেন। ভিনদেশি নায়িকারা খ্যামটা নেচে ট্রফি নিয়ে যাবেন, আর ঢাকার নায়িকারা কি বসে-বসে কড়িকাঠ গুনবেন? তারাও নেমে যান পোশাক খাটো করার প্রতিযোগিতায়। এই অসুস্থ, দমবন্ধ, শ্বাসরূদ্ধকর সময়ে পূর্ণিমা আসেন দখিন হাওয়া হয়ে।

প্রথম ছবির ব্যর্থতা, দীর্ঘ অপেক্ষা

১৯৯৮ সালের ১৫ই মে মুক্তি পায় পূর্ণিমার অভিষেক ছবি 'এ জীবন তোমার আমার'। জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত এই ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন রিয়াজ। 'পড়ে না চোখের পলক' গানের সঙ্গে তার নাম ছড়িয়ে যায় শহর-নগর-বন্দরে। কিন্তু একই দিনে মুক্তি পাওয়া শহীদুল ইসলাম খোকনের 'ভন্ড' ছবিটি বক্স অফিসে সফল হয়, আর 'এ জীবন তোমার আমার' ব্যর্থ হয়। অথচ ছবিটিতে ছিল আলাউদ্দিন আলীর অসাধারণ সুরে ভর্তি ১৫টি রিল, আর একদম তাজা নতুন জুটি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পূর্ণিমাকে প্রথম সুপারহিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৯ ছবি পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত রাজু, রিয়াজ ও পূর্ণিমা বক্স অফিস জয় করেন 'নি:শ্বা‌সে তু‌মি বিশ্বা‌সে তু‌‌মি'র মধ‌্য দি‌য়ে। এর আগে নায়করাজ রাজ্জাকের দুটি ছবি 'সন্তান যখন শত্রু' এবং 'প্রেমের নাম বেদনা'য় অভিনয় করেন পূর্ণিমা। রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন্সের সঙ্গে কাজ মানেই সুপারস্টার খেতাব পাওয়া। নায়করাজের নির্দেশনায় কাজ একজন তরুণ শিল্পীর কাছে শিক্ষাসফরের চেয়ে কম নয়।

সুপারস্টার তৈরির জহুরী নির্মাতার অভাব

বক্স অফিসে ব্যর্থ একটা ছবি থেকে কীভাবে একজন সফল তারকার জন্ম হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত পূর্ণিমা। ছাইভস্ম থেকে হীরা খুঁজে এনে দর্শকের দরবারে পেশ করতে জানতেন সেই সময়ের নির্মাতারা। এমন জহুরী-নির্মাতার অভাবেই আজকাল সুপারস্টার তৈরি হচ্ছে না। সমস্ত সম্ভাবনা মজুদ থাকার পরও ভ্রুণ অবস্থায় মরে যাচ্ছে, অঙ্কুরে ঝরে যাচ্ছে প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা।

উদাহরণ হিসেবে নাজিফা তুষির কথা বলা যায়। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত অভিনেত্রী। রায়হান রাফীর 'প্রেশার কুকার' আর মেজবাউর রহমান সুমনের 'রইদ' ছবিতে অভিনয় করে তুষি জ্বলছেন ধ্রুবতারার মতো। অথচ একজন সুপারস্টার হিসেবে তিনি জ্বলে উঠতে পারছেন না। ২০১৬ সালে রেদওয়ান রনির 'আইসক্রিম' ছবিতে তার অভিষেকের ১০ বছর পূরণ হচ্ছে চলতি বছর। এক দশকেও সুপারস্টার হয়ে উঠতে পারেননি তুষি।

২০২২ সালে মেজবাউর রহমান সুমনের 'হাওয়া' সুপারহিট হয়েছে। তুষির নামে জয়ঢাক বেজেছে। তারপর চারটা বছর কেটে গেছে। তুষির নাম যখন সবাই ভুলতে বসেছে, তখনই তার সদর্পে প্রত্যাবর্তন। কিন্তু প্রশংসার তুবড়ি, স্তুতির লহর, বন্দনার বহর—এরমধ্যেই কি সব শেষ? তুষি কি একজন পূর্ণিমা হয়ে উঠতে পারতেন না?

কেন আমরা সুপারস্টার তৈরি করতে পারছি না?

পূর্ণিমার পর আর কোনো সুপারস্টার অভিনেত্রী পেলাম না কেন? কেন বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে প্রতিবেশী দেশ থেকে নায়িকা আমদানি করতে হয়? কেন আমরা আলিয়া ভাট, কিয়ারা আদভানি, রাশমিকা মান্দানার মতো সুপারস্টার তৈরি করতে পারছি না? আমাদের সিনেমার মান আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। চৌর্যবৃত্তি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। স্থানীয় গল্পে হাসছে বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবগুলো। অথচ আমরা সুপারস্টার জন্ম দিতে ভুলে গেছি। বক্স অফিসের সঙ্গে শিল্পমানের গতিময় গাঁটবন্ধন যে হতে পারে, সেই বিদ্যা আমরা ভুলতে বসেছি।

পূর্ণিমা কি চাষী নজরুল ইসলামের 'সুভা', 'শাস্তি', 'মেঘের পরে মেঘ' করেননি? আবার তিনিই 'মনের মাঝে তুমি'র মতো ব্লকবাস্টার ছবির অভিনেত্রী। তার অভিনয়দক্ষতা নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তুষিদের পক্ষেও সম্ভব একই সঙ্গে সিনেপ্লেক্স আর সমালোচকদের তুষ্ট করা। কিন্তু সেই নির্মাতাদেরই আজ অভাব যারা সুপারস্টার তৈরির নিরলস কাজটি করতে পারেন। সেই প্রযোজনা সংস্থা আর নেই যারা একজন অভিনেত্রীর ওপর বাজি ধরতে পারেন। বর্তমানে সিনেমার সামগ্রিক কাঠামোটাই সুপারস্টার অভিনেত্রী তৈরির প্রতিকূলে। সিনেমায় এখনও অনেক রাত। পূর্ণিমার প্রয়োজন। অনেক আলো চাই।