ঢাকাই চলচ্চিত্রের মূল কেন্দ্র বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। গত ১৭ জুন বিএফডিসির ৭ নম্বর শুটিং ফ্লোরে গিয়ে দেখা গেছে, তালা খুলতে দুজন কর্মীকে কসরত করতে হয়েছে। ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ, বাতি জ্বালানোর পরও কিছুই দেখা যায় না, চারপাশে ভুতুড়ে পরিবেশ। অন্য ফ্লোরগুলোর অবস্থাও প্রায় একই। ছাদ বেহাল, দেয়ালে ফাটল, মেকআপ রুমের ড্রেসিং টেবিল আর আয়নায় জমেছে ধুলা।
বৃষ্টিতে আতঙ্ক
কর্মীরা জানিয়েছেন, মুষলধারে ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন ফ্লোরের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। ৭ জুলাই প্রথম আলোর আলোকচিত্র সাংবাদিক শুভ্র কান্তি দাশ বিএফডিসির ফ্লোরগুলোর ছবি তুলতে গেলে ছাদ চুইয়ে পড়া পানি দেখা যায় কোনো কোনো ফ্লোরের মেঝেতে। সে পানি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য কর্মীরা নানা কসরত করছিলেন। বিএফডিসিতে কর্মরত ব্যক্তিরা বলছেন, বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক। শুটিংয়ের জন্য যাঁরা ফ্লোরগুলো ভাড়া নেন, তাঁরাও বিরক্ত হন। বৃষ্টিতে শুটিংয়ের জিনিসপত্র নষ্ট হয়। এই বর্ষায় শুধু ফ্লোরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে না; ড্রেন উপচে বিএফডিসি কার্যালয়ও পানিতে থইথই করে।
সংস্কারের চিঠি, কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই
বিভিন্ন ফ্লোরের ছাদ এবং ড্রেনের কিছু অংশ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গত ৫ এপ্রিল বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে জরুরি ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা চাওয়া হয়। তবে এ চিঠির পর কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। মাসুমা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে এখনো তেমন কোনো উদ্যোগের কথা জানানো হয়নি।”
ফ্লোরগুলোর গুরুত্ব
বিএফডিসিতে মোট ফ্লোর ছিল ৯টি। বর্তমানে কার্যকর ফ্লোর আছে পাঁচটি। এগুলো ভাড়া দিয়ে মাসে ২০ লাখ টাকার মতো আয় আসে। ফ্লোরগুলো দিন ও শিফট অনুযায়ী ভাড়া দেওয়া হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২০টি সিনেমার শুটিং হয়েছে এফডিসিতে, মূলত ফ্লোরগুলোতে।
গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর শুটিং হয়েছিল বিএফডিসিতে। সিনেমাটির নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর প্রথম আলোকে বলেন, “বিএফডিসির এত বড় ফ্লোর পাওয়া না গেলে সিনেমাটিই বানানো সম্ভব হতো না।” তবে তিনি সমস্যার কথাও জানান: “প্রথম সমস্যায় পড়তে হয় টয়লেট নিয়ে। ফ্লোরের ভেতরে একটি আছে, সেটি কতজন ব্যবহার করবে? যা–ও আছে, তা পরিচ্ছন্ন না। এ ছাড়া এফডিসির যন্ত্রপাতি অনেক পুরোনো, এগুলো দিয়ে কাজ করা কঠিন। তাই বাইরে থেকে যন্ত্রপাতি ভাড়া নিতে হয়েছে। এতে খরচ বেড়েছে।”
বিজ্ঞাপনী সংস্থা ব্ল্যাকবোর্ডের সহকারী ব্যবস্থাপক রুবায়েত বিন বাশার বলেন, “ফ্লোরে প্রচুর গরম। পরিষ্কার না। সব থেকে বড় সমস্যা টয়লেট সমস্যা। তবে এফডিসি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ফ্লোরগুলোর ভাড়া কমিয়েছে। বাইরের শুটিং বাড়ির তুলনায় এখানে কম খরচে শুটিং করা সম্ভব হচ্ছে।”
আর্থিক সংকট
বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান বলেন, “বিএফডিসি বহুতল কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। তবে নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। নির্মাণকাজ চলায় প্রতিষ্ঠানের আয় আরও কমে গেছে। বর্ষায় বেহাল ফ্লোরগুলো ভাড়া নিতে চান না অনেকে। ২০১৬ সালের পর নতুন কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি।”
বিএফডিসির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) মামুনূর রশীদ, যিনি ২৯ বছর ধরে এখানে কর্মরত, তিনি বলেন, “একসময় ফ্লোরগুলোতে তালা লাগানোরই ফুরসত পাওয়া যেত না। প্রায় ২৪ ঘণ্টা কাজ হতো। ফ্লোর বন্ধ করাই মুশকিল হতো। এক দলের কাজ শেষ হওয়ার আগে আরেক দল উপস্থিত হলে অনেক সময় মারামারিও লেগে যেত। ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্তও এমন অবস্থা দেখা গেছে।”
বিএফডিসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট-ঘাটতি ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলে মাসিক ব্যয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় মাসে গড়ে ৩০ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি থাকছে ৮০ লাখ টাকা।
ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে
বিএফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন হিসেবে। অ্যানালগ যুগে চলচ্চিত্র নির্মাণের একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। রাজ্জাক, শাবানা, রোজিনা, সুচন্দা, আলমগীর, ববিতা, জাফর ইকবাল, সালমান শাহ—এমন নায়ক–নায়িকাদের উপস্থিতিতে একসময় এফডিসির শুটিং ফ্লোরগুলো গমগম করত।
অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশে দেরি করে পিছিয়ে পড়ে বিএফডিসি। ২০১৪ সালে এখানে প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা আসে, অথচ ২০১২ সালে দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে ডিজিটাল চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একটি প্রতিবেদনে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ ১১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা অনুদান চেয়েছে। তাতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট-ঘাটতি ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।



