ছিনতাইয়ের চেষ্টায় মার খেয়ে পালাল দুই যুবক
অন্ধকার গলিতে লিটনের গালে জোরালো ঘুষি লাগতেই চোয়াল নড়ে যায়। দ্রুত দৌড়ে পালাতে থাকে সে। পেছন থেকে ধুপধাপ করে দৌড়ে আসছে তার বন্ধু নান্নু। লোকজন তাদের তাড়া করছে কিনা, তা দেখতে একটু পরপর পেছনে তাকাচ্ছে দুজন। ধরা পড়লে গণপিটুনি খেতে হবে—এ বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। লিটন আর নান্নু দুজনই ছিনতাইকারী, কিন্তু নিজেদের পেশায় একেবারেই নাম করতে পারেনি তারা।
ছিনতাইয়ের সময় মোবাইলে রিল দেখার ফল
ছিনতাই করতে গিয়েই মারটা খেয়েছে লিটন। বিশালদেহী হওয়ায় ধাক্কাটাক্কা দিয়ে কোনোমতে বেঁচে গেছে নান্নু। শেষমেশ নিরাপদ এলাকায় এসে থামে দুজন। রিপনের চায়ের দোকানে বসে নান্নু লিটনকে বলে, ‘তোর কপালডা ভালো রে।’ ঠান্ডা পানির বোতল কপালে ঘষছিল লিটন। নান্নুর কথা শুনে কপাল থেকে বোতলটা সরায়। কপালের এক পাশ ফুলে আলু হয়ে গেছে।
নান্নু হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘দৌড়ানির চেয়ে মাইর খাওয়া ভালো, এই শইল... নিয়া...দৌড়ানো চাপ!’ লিটন জবাব না দিয়ে কপালের ফোলা অংশটা দেখায় নান্নুকে। নান্নু ঝুঁকে হাত দিয়ে কপালটা পরখ করে চুকচুক শব্দ করে বলে, ‘এহ, নিজের দোষেই মাইরটা খাইলি। কামের সময় তোর মোবাইল গুঁতানো লাগব ক্যান?’
অন্ধকার গলিতে ছিনতাইয়ের ঘটনা
অন্ধকার গলিতে একটা মুরগি পেয়েছিল ওরা। লোকটা যে পয়সাওয়ালা, দেখেই বুঝেছিল লিটন। গলিতে ঢুকতেই লোকটাকে আটকায় ওরা। ছুরি হাতে দাঁড়ায় লিটন। পাশ থেকে হুংকার দেয় নান্নু—‘যা আছে বাইর কর!’ চমকে উঠে লোকটা। মুখ সাদা হয়ে যায় ভয়ে। মোবাইল, মানিব্যাগ নান্নুর হাতে দিয়ে বলে, ‘জুতার ভেতর আরও টাকা লুকানো আছে, দেব?’ নান্নু ধমক দিয়ে বলে, ‘দেন...ধুরো। দে।’
লোকটা ঝুঁকে জুতা খুলতে শুরু করে। সময় নিচ্ছিল বেশি, বিরক্ত হয়ে লিটন পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও দেখতে শুরু করে। কতক্ষণ দেখেছে টেরই পায়নি, হঠাৎ প্রচণ্ড এক লাথি খেয়ে হাত থেকে ছুরিটা পড়ে যায়। তারপর ধামাধাম কয়েকটা ঘুষি খায় মুখে, কপালে। লোকটা যে এই বুদ্ধি করেছে, কে জানত! কোত্থেকে লোকজন ছুটে আসে। ভয় পেয়ে মোবাইল-মানিব্যাগ ফেলে দৌড় দেয় নান্নু। সামলে নিয়ে দৌড় শুরু করে লিটনও।
অজ্ঞান পার্টির প্রস্তাব
চায়ের দোকানে বসে লিটন আক্ষেপ করে বলে, ‘শালার এই রিলের নেশা ছাড়তেই পারতেসি না।’ নান্নু জিজ্ঞেস করে, ‘কিন্তু তুই ব্যাটা কী করলি? লোকটা যে এই ফন্দি করসে, খেয়াল করবি না? তুই কী করতাসিলি?’ লিটন উত্তর দেয়, ‘আমিও রিল দেখতাসিলাম। ভাবলাম, দেখি হালায় কী কী ভিডিও দেখে...ছি ছি ছি...যা-তা।’
পাশ থেকে কে যেন বলে, ‘তোরা যে ছিনতাই করস, লজ্জা লাগে না?’ নান্নু রেগে জবাব দেয়, ‘ক্যান? লজ্জা লাগব ক্যান? ভিক্ষা করি নাকি? খাইট্টা খাই।’ ফোনের টর্চ জ্বেলে দেখার চেষ্টা করে লোকটা কে। মাঝবয়সী একজন লোক। চায়ের কাপের গভীরে পড়ে থাকা আদা আঙুল দিয়ে বের করে খাচ্ছে।
লোকটা বলে, ‘শোন, তোরা এই কাজ ছাড়। এই বেরেন দিয়া ছিনতাই হইব না। আমার লগে আয়। কাম দিমু। ভালো ইনকাম।’ নান্নু জিজ্ঞেস করে, ‘কামটা কী?’ লোকটা উত্তর দেয়, ‘আমার পার্টির মেম্বার হবি।’
রাজনীতিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত
কপালে বোতল ঠেকিয়েই উঠে দাঁড়ায় লিটন। উত্তেজিত হয়ে যায় সে। বলে, ‘আমরা ছিনতাইকারী হইতে পারি, কিন্তু আমগো একটা নীতি আছে। কোনো পলিটিকসের মধ্যে আমরা নাই। আর আপনি তুই তোকারি করেন কেন? আমরা সিনিয়র ছিনতাইকারী।’
লোকটা বলে, ‘আরে, গরম হইয়ো না। এই পার্টি ওই পার্টি না। এটা হইল অজ্ঞান পার্টি। নীতি আমারও আছে। আমি জ্ঞান থাকা মানুষের কাছ থেইকা কিছু নেই না। একটা মানুষ অজ্ঞান, তার জিনিসপত্র নিজের হেফাজতে রাখা তো আমার দায়িত্ব, নাকি?’ লিটন বলে, ‘তারে অজ্ঞান তো আপনেই করসেন।’ লোকটা ব্যাখ্যা করে, ‘এটা তো পেশাগত কারণে করতে হইতাসে। ক্যান, অপারেশনের আগে ডাক্তার কি রোগীরে অজ্ঞান করে না? আমিও তো অজ্ঞানই করতাসি। আমারটাও একরকমের অপারেশন বলতে পারো। খালি পেলেসটা মনে করো আলাদা। আমি বাসে, লঞ্চে, রাস্তাঘাটে কামডা করি।’
ট্রেনিং ও প্রথম অপারেশনে ব্যর্থতা
লোকটা বলে, ‘ঈদের টাইম তো, লোকবল কম। সাপ্লাই দিয়া কুলাইতে পারতাসি না। রানিং লোক দরকার। তোমরা রাজি থাকলে কও, হালকা একটা ট্রেনিং দিয়া ফিল্ডে নামায় দেই।’ লিটন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার লাভ?’ লোকটা বলে, ‘ওই যে, কমিশন। যা কামাইবা, তার ২০ পারসেন্ট আমার।’ নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে লিটন-নান্নু। তারা রাজি হয়।
ট্রেনিং শেষে অপারেশনে আসে লিটন-নান্নু। নান্নুর পকেটে রুমাল। এই রুমাল নাকে চেপে ধরলে যে কেউ জ্ঞান হারাবে। পকেট ক্লিয়ার করবে লিটন—এটাই প্ল্যান। জানালার পাশের সিটে বসেছে নান্নু। তার পেছনের সিটে বাঁ পাশে লিটন। মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় দুজনই। বাস হাইওয়েতে উঠতেই হঠাৎ চিৎকার করে উঠে নান্নুর পাশে বসা লোকটা। ঘটনা কী? চমকে উঠে লিটন।
লোকটা বলে, ‘আরে, এই লোক তো ফিট হইয়া গেছে! কী সর্বনাশ! মনে হইল হঠাৎ পাহাড়ধস...।’ লিটন তাকিয়ে দেখে, নান্নু অজ্ঞান হয়ে পাশের যাত্রীর ওপর ঢলে পড়েছে। সামনে একটা ক্লিনিক খুঁজে বাস থামানো হয়। বাসের কয়েকজন যাত্রী মিলে কোনোমতে ধরে নামায় নান্নুকে। লিটনের জিম্মায় নান্নুকে রেখে বাকিরা আবার ফিরে যায় বাসে। কয়েক ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে নান্নুর।
নিজের কেমিক্যালে নিজেই অজ্ঞান
লিটন জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে, কেসটা কী?’ নান্নু উত্তর দেয়, ‘আর কইস না, যে ধুলা, হঠাৎ হাঁচি আইলো। পকেট থেইকা রুমালটা বাইর কইরা হাঁচি দিসি...তারপর আর কিছু মনে নাই।’ লিটনের হাত থেকে বোতল নিয়ে পানি খায় নান্নু।
লিটন জিজ্ঞেস করে, ‘কোন পকেট থেইকা রুমাল নিসোস? ডান পকেট না বাম পকেট?’ নান্নু বলে, ‘ডান পকেট।’ লিটন হতাশ হয়ে কপাল চাপড়ে বলে, ‘হালা বলদ, ওইটার মধ্যেই তো অজ্ঞান করার কেমিক্যাল দেয়া আছিল!’ কপালের ফোলা এখনো কমেনি। নান্নু আবার জ্ঞান হারাচ্ছে। লিটন টের পায়, ইমার্জেন্সির কথা ভেবে পানির বোতলেও অজ্ঞান করার কেমিক্যাল রেখেছিল। ওটাই খেয়েছে নান্নু গাধাটা। হায় রে গাধা!



