সত্যজিৎ রায়ের ১০৬তম জন্মদিনে বরুণ চন্দের স্মৃতিচারণ
সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনে বরুণ চন্দের স্মৃতি

বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ১০৬তম জন্মদিন আজ। তার নির্মিত ‘সীমাবদ্ধ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই পরিচিতি পেয়েছিলেন ভারতীয় অভিনেতা বরুণ চন্দ। এ দিন তাঁর সঙ্গে কাজের স্মৃতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মরণ করলেন তিনি।

প্রথম দেখা ও মুগ্ধতা

ভারতীয় গণমাধ্যমে এক দীর্ঘ স্মৃতিচারণে বরুণ চন্দ তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায় তথা “মানিকদা”-কে ঘিরে তাঁর শ্রদ্ধা, ভয়, ভালোবাসা এবং একজন নির্মাতা হিসেবে রায়ের অসাধারণ সব দৃষ্টিভঙ্গি। বরুণ চন্দ জানান, সত্যজিৎ রায়কে তিনি প্রথম দেখেন কলকাতার ধর্মতলার নিউ এম্পায়ার চত্বরে বইয়ের দোকানে। উচ্চতা, ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের বিস্তারে তিনি তখনই মুগ্ধ হয়েছিলেন। তবে সরাসরি কথা বলতে সাহস পাননি—কারণ তাঁর মতে, রায় ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি একইসঙ্গে চিত্রশিল্পী, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সময়ের অনেক এগিয়ে থাকা একজন মানুষ।

সম্পর্ক গড়ে ওঠা

পরবর্তীতে ‘তিন কন্যা’ ছবির সময় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে রায়ের উপস্থিতি এবং তাঁর কণ্ঠের প্রশংসা শুনে বরুণ চন্দের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এরপর একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করার সময় এবং পরবর্তী সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি

তিনি স্মরণ করেন, সত্যজিৎ রায় তাঁর কাছে ছিলেন অত্যন্ত পর্যবেক্ষণশীল একজন নির্মাতা, যিনি অভিনয় শেখাতেন না—বরং অভিনেতা নির্বাচন করতেন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। তাঁর মতে, রায়ের “জহুরির চোখ” ছিল, যা দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই অসাধারণ অভিনেতা খুঁজে নিতেন। বরুণ চন্দের ভাষ্যে, “অভিনেতাদের পরিচালনা করা মোটেও পছন্দ ছিল না ওঁর। ওয়ার্কশপে একেবারেই বিশ্বাস করতেন না তিনি। আজকাল তো চারদিকে ওয়ার্কশপের বহর। ওঁর কিন্তু জহুরির চোখ ছিল। তিনি জানতেন কাকে দিয়ে অভিনয় হবেই। কথা বলার ধরন, অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে দেখেই আঁচ করে নিতেন। আনকোরা, সাধারণের মধ্যে দিয়ে তিনি অভিনয়সত্তা বার করে আনার ক্ষমতা রাখতেন। প্রতি ছবিতেই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন। ভুল হতেই পারত, কিন্তু ঝুঁকি নিতেন। ওই যে বললাম, জহুরির চোখ ছিল।”

শুটিং সেটের অভিজ্ঞতা

বরুণ চন্দের মতে, রায় শুটিং সেটে খুব কম নির্দেশ দিতেন। এক টেকেই শট নেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। বরুণ স্মরণ করেন, ‘সীমাবদ্ধ’ ছবির একটি সংলাপবিহীন দৃশ্যের জন্য পুরো এলাকা খালি করে দিয়েছিলেন রায়, যাতে অভিনেতার মনোযোগ একটুও বিভ্রান্ত না হয়। তাঁর মতে, সত্যজিৎ রায় কখনোই সরাসরি ‘ভালো হয়েছে’ বা ‘খারাপ হয়েছে’ বলতেন না। পরিবর্তে তিনি নিঃশব্দ প্রতিক্রিয়াতেই বোঝাতেন কাজের মান। এই নীরবতা অনেক সময়ই অভিনেতাদের কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষার জায়গা হয়ে উঠত।

ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক জীবন

বরুণ চন্দ আরও জানান, রায়ের ব্যক্তিত্বকে অনেকেই দূর থেকে গম্ভীর বা গর্বিত ভাবলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও সংযত স্বভাবের মানুষ। পুরস্কার গ্রহণ বা মঞ্চে ওঠা পর্যন্ত তিনি অনেক সময় এড়িয়ে চলতেন। তবে ‘পথের পাঁচালী’-এর সাফল্যের পর সেই সংকোচ কিছুটা ভেঙে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। পারিবারিক জীবনে রায় ছিলেন দায়িত্বশীল ও স্নেহশীল বাবা এবং বন্ধুসম স্বামী। তবে বরুণ চন্দের মতে, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন গভীরভাবে একা—একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে ‘লোনলি অ্যাট দ্য টপ’ অবস্থায় থাকা তাঁর নিয়তি ছিল।

শেষ সময় ও আবেগঘন স্মৃতি

স্মৃতিচারণের শেষে বরুণ চন্দ বলেন, সত্যজিৎ রায়ের শেষ সময় তাঁকে কষ্ট দেয় এবং তিনি সেই দৃশ্য স্মরণ করতে চান না। তবে তাঁর মতে, মধ্যগগনে থাকা রায়ের যে সৃজনশীল রূপ তিনি দেখেছেন, সেটিই আজীবন তাঁর মনের মধ্যে বেঁচে থাকবে। শেষে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আপনিই আমার রিয়্যাল লাইফ হিরো, মানিকদা। আবার যদি সুযোগ হতো, আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাইতাম।”