শনিবার ভোর থেকে আবারও ভারি বৃষ্টি শুরু হওয়ায় নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার হাওরাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মাঠে থাকা অবশিষ্ট বোরো ধান নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অনেক এলাকায় আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। এর আগেই সাম্প্রতিক ভারি বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং শিলাবৃষ্টিতে উপজেলার বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ফসলহানির প্রাথমিক হিসাব
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১০০ কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে ফসলহানির ধাক্কায় দুই কৃষাণির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মারা যাওয়া দুই কৃষাণি হলেন- কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুর গ্রামের খোকন বেগম (৪৫) এবং যাদবপুর গ্রামের সঞ্চিতা সরকার (৫৫)।
দুই কৃষাণির মৃত্যু
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ এপ্রিল বিকেলে টানা বৃষ্টি ও ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে হাওরে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান কাটতে যান খোকন বেগম। সেখানে অতিরিক্ত ঠান্ডা ও অসুস্থতায় তিনি মাঠেই মারা যান। অন্যদিকে, বিধবা কৃষাণি সঞ্চিতা সরকার চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। কিন্তু শিলাবৃষ্টিতে তার পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে গত ২১ এপ্রিল ভোরে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ক্ষতির পরিমাণ
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, এ মৌসুমে উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৪ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। নিমজ্জিত ফসলের মধ্যে ২ হাজার ৩৮০ হেক্টর পুরোপুরি এবং ১ হাজার ৮০৫ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩০ হাজার ২৯৬ মেট্রিক টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মেন্দিপুরের রোয়াইল হাওর, কৃষ্ণপুরের ছায়ার হাওর, খালিয়াজুরী সদরের পাঙ্গাসিয়া হাওর এবং নগর ইউনিয়নের আদমপুর ও উদয়পুর হাওর এলাকা।
কৃষক পরিবারের ক্ষতি
উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার কৃষক পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৩ হাজার পরিবার সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণের কাজ চলমান রয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায়, টানা দুই দিন বৃষ্টি না থাকায় কৃষকরা নতুন উদ্যমে ধান কাটতে মাঠে নেমেছিলেন এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে অবশিষ্ট ফসলের একটি অংশ এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। উজান এলাকায় ভারি বৃষ্টির কারণে হাওরাঞ্চলে পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে খালিয়াজুরীসহ আশপাশের হাওর এলাকায় বাকি ফসল দ্রুত কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সহায়তার আশ্বাস
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকা ধরে তাদের সহায়তা দেওয়া হবে।



