মে দিবসের ইতিহাস ও সাহিত্য: শ্রমিক অধিকারের লড়াই
মে দিবসের ইতিহাস ও সাহিত্য: শ্রমিক অধিকারের লড়াই

শুভ মে দিবস, সহযোদ্ধারা! আজ আমরা উদ্‌যাপন করছি আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার—সঙ্গে পুরোনো পৌত্তলিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বসন্তের উৎসবও। আশা করি, আজ তোমরা ঠিক বিকেল পাঁচটায় কাজ গুটিয়ে সূর্যের আলোয় কিছুটা সময় কাটাবে।

শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা

যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকরা অন্তত ১৮৬০-এর দশক থেকেই উন্নত কাজের পরিবেশের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। তবে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা আমরা সাধারণত ১৮৮৬ সালের শিকাগো থেকে ধরেই থাকি। সেই বছরের ১ মে, হাজার হাজার শ্রমিক কাজ ছেড়ে রাস্তায় নেমে আট ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবিতে প্রতিবাদ জানান। ধর্মঘটের চতুর্থ দিনে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।

প্রতিবাদ দমাতে পুলিশ ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালায়। সংগঠকদের কেউ কেউ নিহত হন, এবং পরবর্তী ‘হে-মার্কেট’ ঘটনার সহিংসতায় অনেকেই আহত হন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লেখক জেফ শুরকে ‘জ্যাকোবিন’-এ তাঁর একটি চমৎকার ইতিহাসে লিখেছেন, চার বছর পর এই ঘটনাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়, যখন “বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা (তখনও আইনে স্বীকৃত নয় এমন) আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে ধর্মঘট ও বিক্ষোভে অংশ নেন।” সেই আন্দোলনকারীরা হে-মার্কেটের নিহতদের স্মরণ করে তাঁদের কর্মসূচির দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ নামে ঘোষণা করেন। এভাবেই জন্ম নেয় মে দিবস।

সাহিত্য ও মে দিবস

শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে লেখকদের সম্পর্ক বরাবরই নিবিড়। যেমন বিখ্যাত নৈরাজ্যবাদী এমা গোল্ডম্যান, যিনি এই আন্দোলন নিয়ে প্রবন্ধ, পুস্তিকা ও আত্মজীবনী লিখেছেন। তবে প্রথম দিককার মে দিবসের সঙ্গে কিছু লেখকের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে।

আপটন সিনক্লেয়ারের The Jungle মূলত শ্রমিক অধিকারের পক্ষে একটি শক্তিশালী দলিল। আমেরিকার মাংস প্রক্রিয়াজাত শিল্পের অন্ধকার দিক তুলে ধরা এই উপন্যাসটি—যা অনেকেই স্কুলজীবনে পড়েছে—প্রথমে সমাজতান্ত্রিক পত্রিকা Appeal to Reason-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯০৬ সালে বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর এটি ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করে। যদিও সিনক্লেয়ারের প্রত্যাশা মতো সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ বদলায়নি, তবু কারখানার বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ফলে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন পাস হয়। (আর আজও এই বই অনেক কিশোরকে নিরামিষভোজী হতে প্রভাবিত করে!)

সিনক্লেয়ারের এই সফল কাজটি ‘মাকরেকিং’ বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক নতুন ধারার সূচনা করে। ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত অনেক লেখক তাঁর পথ অনুসরণ করেন। আইডা বি. ওয়েলসের মতো অগ্রণী সাংবাদিকদের কাজও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায় কর্মপরিবেশ উদ্‌ঘাটন তখন ম্যাকক্লুর’স-এর মতো সাময়িকীতে একটি সাধারণ চর্চা হয়ে ওঠে। আইডা টারবেল স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির বিরুদ্ধে লিখেছেন, লিঙ্কন স্টেফেন্স নগর দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছেন। আর শ্রমিক বিষয়ক লেখায় সিনক্লেয়ার আবার কয়লা শিল্প নিয়েও লিখেছেন।

১৯০৮ সালে শ্রমিক আন্দোলন আরেক ধরনের ‘Appeal to Reason’ পায়। শ্রমিক নেতৃত্বাধীন বিপ্লবকে কল্পনা করে লেখা জ্যাক লন্ডনের The Iron Heel—একটি ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস। সারাজীবন সমাজতন্ত্রী থাকা লন্ডনের এই সরাসরি পুঁজিবাদবিরোধী রচনা একটি বিকল্প বাস্তবতার ইতিহাস হিসেবে হাজির হয়। ট্রটস্কিও এই বইয়ের “ট্রেড ইউনিয়ন আমলাতন্ত্র” বিশ্লেষণের প্রশংসা করেছিলেন। The Iron Heel পরবর্তী প্রজন্মের বহু পুঁজিবাদ-সমালোচনামূলক লেখককে অনুপ্রাণিত করে— জর্জ অরওয়েল তাদের মধ্যে অন্যতম।

তবে সব আলোচিত বিষয়ের মতো এখানেও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে। ১৯২০ সালে এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড “May Day” নামে একটি গল্প লেখেন, যেখানে আইভি লিগের কিছু তরুণ শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবছে। Tales of the Jazz Age সংকলনে অন্তর্ভুক্ত এই গল্পে ফিটজেরাল্ডের দৃষ্টিভঙ্গি সিনক্লেয়ার, লন্ডন বা অরওয়েলের মতো সরাসরি মতাদর্শিক নয়; বরং অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। যদিও এটি প্রচারধর্মী লেখা নয়, তবু এতে অচেতন সুবিধাভোগী জীবনের এক ধরনের মানসিক চাপের বিশ্লেষণ রয়েছে—যা আজকের সাহিত্যেও প্রাসঙ্গিক।

মে দিবসে পড়ার উপকরণ

হয়তো তোমার মে দিবসে এমন কোনো উপন্যাসই মানানসই। তবে শ্রমিক আন্দোলনের ঘোষণাপত্র থেকে আত্মজীবনী পর্যন্ত ইতিহাস জানতে চাইলে অসংখ্য নন-ফিকশন বই আছে। ভার্সো বুকস-এর মতো প্রকাশকদের কাছে শ্রমিক অধিকারের ওপর সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে, আর আজকের দিনে তারা বিশেষ ছাড়ও দিচ্ছে।

আর যদি পড়ার চেয়ে শোনার ইচ্ছে থাকে, তবে Haymarket Originals-এর নতুন পডকাস্ট “Fragile Juggernaut” ১৯৩০-এর দশকে সিআইও গঠনের মধ্য দিয়ে আমেরিকার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে।

আজ আমি সাহিত্যিক দৃষ্টিতে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উদ্‌যাপন করছি। অতীতের ইউনিয়ন নেতাদের সংগ্রামের ফলে মানবিক সময়ে কাজ শেষ করে আমি আজ লাইব্রেরিতে যাচ্ছি—পিটার লাইনব’র The Incomplete, True, Authentic, and Wonderful History of May Day বইটি নিতে। পড়ে কেমন লাগল, অবশ্যই জানাবো।

মূল: ব্রিটানি অ্যালেন