নাসির আলী মামুনের ৬৭তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন: প্রতিকৃতি শিল্পের মাইলফলক
বাংলাদেশে প্রতিকৃতি আলোকচিত্রের পথিকৃৎ নাসির আলী মামুনের ৬৭তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী 'ফটোজিয়াম: স্মৃতি–বিস্মৃতির মুখচ্ছবি' উদ্বোধন হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম নাসির আলী মামুনের কাজকে অমূল্য সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
প্রতিকৃতি শিল্পের সংবেদনশীলতা
মনিরুল ইসলাম বলেন, "প্রতিকৃতি আলোকচিত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পমাধ্যম। একটি ভালো প্রতিকৃতি তুলতে হলে শুধু বাহ্যিক অবয়ব নয়, মানুষের ভেতরের ব্যক্তিত্ব ধরতে হয়। অনেক সময় একজন আলোকচিত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় সঠিক মুহূর্তটির জন্য। সেই এক সেকেন্ড বা তারও কম সময়ে ঠিক মুহূর্তটি ধরতে পারলেই তৈরি হয় একটি সফল ছবি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্রগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।
ফটোগ্রাফি ও চিত্রকলার সৃজনপ্রক্রিয়া
মনিরুল ইসলাম ফটোগ্রাফি ও চিত্রকলার মধ্যে তুলনা করে বলেন, "ফটোগ্রাফি ও চিত্রকলার মৌলিক ভাবনা এক হলেও প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। ফটোগ্রাফি হলো আলো দিয়ে ছবি আঁকা আর চিত্রশিল্পীরা আঁকেন তুলি বা পেনসিলে। কিন্তু সৃজনপ্রক্রিয়াটা একই।" এই মন্তব্য প্রদর্শনীর শিল্পগত গভীরতা তুলে ধরে।
বাংলা একাডেমির ভূমিকা
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, "কোনো লেখক বা শিল্পীর কাজকে তাঁর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তাঁর মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায় না। সেদিক থেকে নাসির আলী মামুন লেখকদের আলোকচিত্র সংরক্ষণ করার যে কাজ করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" তিনি এমন একটি মিউজিয়াম খুঁজছেন, যেখানে এই ছবিগুলো যত্ন করে রাখা হবে।
নাসির আলী মামুনের বক্তব্য
আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, "বিশ্ব ফটোগ্রাফির দুই শ বছর উদ্যাপিত হচ্ছে। ১৮২৬ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি ৫৬ বছর যাবৎ সক্রিয়, সে জন্য আমি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি।" তিনি বাংলা একাডেমির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বাংলা একাডেমি ১৯৭৭ সালে তাঁকে আবিষ্কার করেছিল এবং সেই বছরই বইমেলায় তাঁর প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
ফটোজিয়ামের ধারণা
নাসির আলী মামুন এবারের আয়োজনকে 'ফটোজিয়াম' বলার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, "এটি আমার একটি প্রস্তাবিত জাদুঘর। এখানে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠ মানুষদের, খ্যাতিমান মানুষদের পোর্ট্রেট, চিঠিপত্র, হস্তাক্ষর, পাণ্ডুলিপি, ডায়েরি এবং অডিও–ভিজ্যুয়াল সামগ্রী জাদুঘরের চারদেয়ালের মধ্যে স্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য রাখা হবে।"
প্রদর্শনীর বিবরণ
অনুষ্ঠান শেষে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের নিচতলায় ফিতা কেটে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। দুই তলাজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে দেশের খ্যাতিমান প্রয়াত কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কথাসাহিত্যিকদের দুর্লভ কিছু আলোকচিত্র। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম
- পল্লিকবি জসীমউদ্দীন
- কবি শামসুর রাহমান
- কবি আল মাহমুদ
- সাহিত্যিক আহমদ ছফা
- কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ
এই প্রদর্শনী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
সংস্কৃতি জগতে প্রভাব
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম স্বাগত বক্তব্যে বলেন, "নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্র মানে তাতে বিচিত্র রকমের নতুনত্ব, বিচিত্র রকমের ব্যঞ্জনা থাকবে। আগে দেখা হয়নি, বলা হয়নি, উপলব্ধি করা হয়নি—এমন বহু কিছুর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের উদ্ভাস। ফলে এখানে প্রদর্শিত ছবিগুলো যাঁরা দেখবেন, তাঁরা পরিচিতের মধ্যে বহু অপরিচিতের আভাস পেয়ে যাবেন। সৃজনশীল ভাবনার খোরাক পেয়ে যাবেন।" এই প্রদর্শনী জাতীয় সংস্কৃতি ও শিক্ষা জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



