রাশিয়ার উন্নত ড্রোন ইরানে পাঠানো নিয়ে মার্কিন-ইউরোপের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাধিক কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ সংবলিত ড্রোনের একটি চালান ইরানে পাঠাচ্ছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান থেকে প্রাপ্ত ড্রোনের নকশায় পরিবর্তন এনে সেগুলোকে আরও বিধ্বংসী ও নিখুঁত করে পুনরায় ইরানে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
ড্রোন হামলা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইরান এক মাসের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। যদিও ইরানের কাছে নিজস্ব শাহেদ ড্রোনের মজুদ রয়েছে, তবে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই ড্রোনের নেভিগেশন ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি সাধন করেছে।
ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা এপি-কে জানিয়েছেন, চলতি মাসে রাশিয়া থেকে ইরানে ড্রোন হস্তান্তরের বিষয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে অত্যন্ত সক্রিয় আলোচনা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, এই চালানটি একবারের জন্য নাকি ধারাবাহিক কোনও প্রক্রিয়ার অংশ, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
চালানের বিবরণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়ার ড্রোনবাহী একটি চালান বর্তমানে পথে রয়েছে। তবে সেগুলো কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে আজারবাইজান হয়ে ট্রাকে করে মানবিক সহায়তার দুটি কনভয় ইরানে প্রবেশ করেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, এই ট্রাকগুলোতে ড্রোনের চালান থাকতে পারে।
আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অবস্থিত রুশ দূতাবাস জানিয়েছে, গত শুক্রবার উত্তর ইরানের আস্তারায় ১৫০ টন খাদ্যসামগ্রী নিয়ে সাতটি ট্রাক প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার জরুরি অবস্থা বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেলপথে আরও ৩১৩ টন ওষুধ সেখানে পাঠানো হয়েছে। তবে একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, ড্রোন হস্তান্তর যদি ট্রাকে হয়ে থাকে, তবে তার সংখ্যা হবে খুবই সামান্য এবং এটি মূলত তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার একটি প্রতীকী উদ্যোগ হতে পারে।
মার্কিন প্রতিক্রিয়া ও সামরিক সাফল্য
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এপি-কে বলেন, অন্য কোনও দেশ ইরানকে কী সরবরাহ করছে, তা আমাদের অভিযানিক সাফল্যে কোনও প্রভাব ফেলছে না। তিনি জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী এ পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং ১৪০টির বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়া ইরানকে ড্রোনের ধরন ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে। বিনিময়ে ইরানও রাশিয়াকে উদারভাবে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। এমনকি শীর্ষ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজনির মৃত্যুর খবর বিশ্বের বাকি অংশের আগে রুশ কর্মকর্তারা জানতেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের সময় রাশিয়া কোনও সহায়তা না করায় তেহরান হতাশ হয়েছিল। ওই সময় ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছিল। ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ
২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি ড্রোন চুক্তি হয়। শুরুতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ড্রোনগুলো রাশিয়ায় আসলেও পরে রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলের আলাবুগা প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হয়। রুশ বিশেষজ্ঞরা শাহেদ ড্রোনের নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। তারা এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্যামেরা, জ্যামার প্রতিরোধী ব্যবস্থা, জেট ইঞ্জিন এবং এমনকি স্টারলিংক ইন্টারনেট ডিভাইসও যুক্ত করেছেন।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনের অনুরোধে স্পেস-এক্স স্টারলিংক সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় রুশ বাহিনী ফ্রন্টলাইনে কিছুটা সমস্যায় পড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, যেহেতু ইউক্রেনে স্টারলিংক ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই রাশিয়া এখন সেই উন্নত ড্রোনগুলো ইরানকে দিয়ে দিচ্ছে।
রাশিয়ার এই উন্নত প্রযুক্তি ইরানের হাতে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য ড্রোন ভূপাতিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোনগুলোর গতি অনেক বেশি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মোতায়েন থাকা মার্কিন অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম দিয়ে সেগুলো আটকানো চ্যালেঞ্জিং হবে। এতে ব্যয়বহুল উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে, যার মজুদ অত্যন্ত সীমিত।



