কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অভিযোগ গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কিউবার সামরিক বাহিনী মিগ যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ নামের একটি কিউবান-আমেরিকান সংগঠনের দুটি ছোট উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করে। এতে চারজন নিহত হন, যাদের তিনজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
সময়টা গত শতকের নব্বইয়ের দশক। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। নতুন জীবন শুরুর আশায় হাজার হাজার কিউবান উত্তাল সাগরে ছোট ছোট ভেলা ভাসিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিপজ্জনক এই যাত্রায় অনেকেই নিখোঁজ হন বা প্রাণ হারান। এসব মানুষকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে কিউবান-আমেরিকান সংগঠন ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ।
ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ
১৯৯১ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন সাবেক সিআইএ সদস্য এবং ব্যর্থ বে অব পিগস অভিযানে অংশগ্রহণকারী পাইলট হোসে বাসুলতো। তিনি ছোট ছোট উড়োজাহাজ কেনার জন্য লাখ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছিলেন। সংগঠনটি নিয়মিত ফ্লোরিডা প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ে সমুদ্রে বিপদে পড়া কিউবানদের খোঁজ করত এবং কোস্টগার্ডকে খবর দিত।
২৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনা
১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সংগঠনটির আট স্বেচ্ছাসেবক যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির উত্তরের একটি ছোট বিমানবন্দর থেকে তিনটি ছোট উড়োজাহাজ করে রওনা দেন। হোসে বাসুলতো এফএএ-র কাছে পাঁচ ঘণ্টার একটি ফ্লাইট পরিকল্পনা জমা দিয়েছিলেন, যাতে ২৪তম অক্ষরেখার কাছ পর্যন্ত উড়ে যাওয়ার কথা ছিল। যাত্রাপথে তিনি হাভানার বিমান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বেলা ২টা ৫৮ মিনিটে বাসুলতো জানান, ২৪তম অক্ষরেখার দক্ষিণে উড়লে ঝুঁকি আছে, কিন্তু তিনি তা নিতে প্রস্তুত। বেলা ৩টা ২০ মিনিটে তিনি বলেন, দিনটি সুন্দর এবং হাভানাকে ওপর থেকে সুন্দর দেখাচ্ছে। এক মিনিট পর পাইলটরা যুদ্ধবিমান দেখতে পান।
ইন্টার-আমেরিকান কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের প্রতিবেদনে বলা হয়, উড়োজাহাজগুলোকে সরাসরি সতর্কতা দেওয়া বা এলাকা ছেড়ে যেতে বলা হয়নি। বেলা ৩টা ২১ মিনিটে কিউবার উপকূল থেকে ১৮ মাইল দূরে প্রথম উড়োজাহাজটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। এতে নিহত হন পাইলট কার্লোস এ কস্তা ও যাত্রী পাবলো মোরালেস। সাত মিনিট পর কিউবার উপকূল থেকে ৩০ মাইলের বেশি দূরে দ্বিতীয় উড়োজাহাজটিও ধ্বংস করা হয়। এর পাইলট ছিলেন মারিও ম্যানুয়েল দে লা পেনা এবং যাত্রী আরমান্দো আলেহান্দ্রে।
অডিও রেকর্ডে মিগ পাইলটদের উল্লাস ধ্বনিও শোনা গিয়েছিল। এক পাইলট বলেন, ধরেছি ওকে! এবার আর সে আমাদের সঙ্গে ঝামেলা করতে পারবে না।
পরবর্তী ঘটনা ও প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসা তৃতীয় উড়োজাহাজটির যাত্রী সিলভিয়া জি ইরিওনদো বলেন, আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় দিনের আলোতে সবার চোখের সামনে উড়োজাহাজগুলো আকাশে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল নিরস্ত্র ও অসহায় ছোট উড়োজাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ।
মায়ামিতে বসবাসরত কিউবার নির্বাসিত সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসের বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয় ঘটনাটি। তিন দশক ধরে কিউবান-আমেরিকান আইনপ্রণেতা, নির্বাসিত অধিকারকর্মী, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি ও নিহতদের স্বজনেরা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
মামলার প্রক্রিয়া
দক্ষিণ ফ্লোরিডায় এখন প্রায় সবারই জানা যে মায়ামির রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মামলায় ঠিক কতজনকে আসামি করা হবে এবং কী কী অভিযোগ আনা হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এতে মাদক পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি উড়োজাহাজ ভূপাতিত করার ঘটনাও যুক্ত থাকতে পারে।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিচারক দুই কিউবান যুদ্ধবিমানচালক ও তাঁদের কমান্ডিং জেনারেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের কখনো যুক্তরাষ্ট্র হাতে পায়নি। নিহতদের পরিবারগুলো পরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে কিউবা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং ১৯৯৭ সালে ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের রায় পান।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যরা বিচার বিভাগকে চিঠি দিয়ে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান। চিঠিতে একটি অডিও রেকর্ডের উল্লেখ করা হয়, যেখানে রাউল কাস্ত্রোকে উড়োজাহাজ ভূপাতিত করার নির্দেশ নিয়ে আলোচনা করতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হয়।
বেঁচে যাওয়া ও স্বজনদের প্রতিক্রিয়া
নিহত আরমান্দো আলেহান্দ্রের স্ত্রী মার্লেন ত্রিয়ানা বলেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সম্ভাব্য অভিযোগ গঠনের বিষয়ে তিনি খুব বেশি কথা বলতে চান না। তিনি বলেন, অনেক বছর ধরে আমরা এসব শুনে আসছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। অবশেষে কেউ এটা করার সাহস দেখাক, সেটাই এখন সময়ের দাবি। অলৌকিক ঘটনাও ঘটে, তাই আশা ছাড়ছি না।
বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সী হোসে বাসুলতো চলতি বছরের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে সব নথি আছে, এমনকি মিগ পাইলটদের বেতার যোগাযোগের রেকর্ডও। রাউল কাস্ত্রোকে আদালতে আনুন, তাঁকে সরাসরি এখানে হাজির করুন।



