যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে লেবানন-সংক্রান্ত যুদ্ধনীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত ও হতাশ বলে মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা থাকলেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননে তাদের প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং আগ্রাসন আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। বর্তমানে লেবাননের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ট্রাম্পের বিরক্তি ও যুদ্ধবিরতির শর্ত
গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমরা মধ্যপ্রাচ্যের সবাইকে আমাদের আলোচনাগুলো যেন সুন্দরভাবে এগিয়ে যেতে পারে, সে লক্ষ্যে নিজেদের অঙ্গীকার বজায় রাখার আহ্বান জানাই।’ বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ইতিবাচক প্রভাবের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতিসহ যা ঘটছে, তাতে বিশ্ববাজার ইতিবাচকভাবে সাড়া দিচ্ছে। আমরা লেবানন, হিজবুল্লাহ, ইসরায়েলসহ সব ফ্রন্টে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি প্রত্যাশা করছি।’
ইরান বারবার বলেছে, লেবাননে হামলা চলতে থাকলে তারা কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করবে না। গতকাল শুক্রবার রাতভর লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শুক্রবারের নির্ধারিত বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছিল।
ইরানের কঠোর অবস্থান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি বৃহস্পতিবার বলেছেন, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ‘ইরানিদের এবং রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের’ অধিকার সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে নিশ্চয়তা পেয়েছেন। ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’, যা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামেও পরিচিত, এটি ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের একটি নেটওয়ার্ক, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহও অন্তর্ভুক্ত।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেট-ক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, তেহরান যুদ্ধবিরতি এবং লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ‘মজা করছে না’ বা বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘লেবানন সব সময়ই এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কারণ, এটি ইরানিদের জন্য সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
ইসরায়েলের মিত্রদের প্রতিক্রিয়া
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক ঘোষণা হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের মিত্ররা দ্রুত চুক্তিতে লেবানন-সংক্রান্ত শর্তগুলোর সমালোচনা শুরু করেন। তাদের যুক্তি, দেশের ওপর ‘হুমকির’ জবাব দিতে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। ওই চুক্তিতে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) বৃহস্পতিবার বলেছে, ‘সমঝোতা স্মারকের ভাষা দেখে মনে হচ্ছে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের ইসরায়েলি প্রচেষ্টা এবার সম্ভবত বন্ধ করতে হবে, যদিও ইসরায়েল চুক্তির পক্ষভুক্ত নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের কড়া হুঁশিয়ারি
এবার লেবানন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষ নেয়নি। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।
ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট কখনো কখনো বিরক্ত হন। কারণ, আমরা যখনই কোনো বড় অগ্রগতির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাই, তখনই হঠাৎ বৈরুতের কোনো বেসামরিক এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, এমন বহু মানুষ প্রাণ হারান। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।’
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
ত্রিতা পার্সি বলেন, ভ্যান্সের এ বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বাস্তব উত্তেজনার প্রতিফলন। এটি ওয়াশিংটনের সেই সাধারণ হালকা সমালোচনা নয়, যা নীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। তিনি আল-জাজিরাকে আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জনসমক্ষে দেওয়া বার্তার মাত্রা, তীব্রতা ও আক্রমণাত্মক ভাব এখন প্রায় নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ধারা পরিবর্তনের পথে। এর কারণ হচ্ছে ট্রাম্প এই চুক্তিকে তাঁর প্রধান রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছেন এবং তিনি সেই অর্জনের জন্য লড়তে প্রস্তুত।’
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ডাস বলেন, ট্রাম্প ক্রমশ এ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠছেন এবং নেতানিয়াহু লেবাননে তাঁর অভিযান দিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দিতে পারেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এটা অনেক দিন ধরেই স্পষ্ট, নেতানিয়াহু নিজেই এখন মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎসগুলোর একটি। গাজায় যুদ্ধবিরতি অর্জন করতে না পারার প্রধান কারণ তিনি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি দেরি হওয়ার কারণও তিনিই।’



