গত বছরের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি উপেক্ষা করে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আবারও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। শনিবার (২০ জুন) গাজার পৃথক দুটি এলাকায় চালানো এই হামলায় আল জাজিরার একজন ক্যামেরাম্যান এবং দুই শিশুসহ অন্তত ছয় জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দল এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আল-বুরেজ শরণার্থী শিবিরে হামলা
শনিবার প্রথম হামলাটি চালানো হয় মধ্য গাজার আল-বুরেজ শরণার্থী শিবিরে একটি আবাসিক বাড়ি লক্ষ্য করে। ড্রোন থেকে চালানো এই নিখুঁত হামলায় আল জাজিরা মুবাশের চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান আহমেদ উইশাহসহ তিন জন নিহত হন।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘জঘন্য অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, “এই হত্যাকাণ্ড সব আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন এবং এটি সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা ও সত্যের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার ইসরায়েলি নিয়মতান্ত্রিক নীতিরই অংশ।”
আহমেদ উইশাহর পরিচয় ও ইসরায়েলি দাবি
উল্লেখ্য, গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত আল জাজিরার ১২ জন কর্মী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে গত এপ্রিল মাসে আহমেদ উইশাহর ভাই এবং আল জাজিরার প্রতিনিধি মোহাম্মদ উইশাহও ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান।
হত্যাকাণ্ডের পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে যে, আহমেদ উইশাহ হামাসের সামরিক শাখার একজন স্নাইপার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে বরাবরের মতোই এই দাবির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি আইডিএফ।
সাবরা এলাকায় দ্বিতীয় হামলা
অপরদিকে শনিবার গভীর রাতে গাজা সিটির সাবরা এলাকায় আরেকটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। আল-শিফা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে লানা ও জিনা নামের দুই সহোদর শিশু এবং দুই নারী রয়েছেন। হামলায় আহত তাদের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ সাফাদি ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা বাড়িতে বসে ছিলাম, কোনও সতর্কতা ছাড়াই রকেটটি আমাদের ওপর এসে পড়ে। দখলদার বাহিনী এবং মধ্যস্থতাকারীরা যে যুদ্ধবিরতির কথা বলে, এটিই কি সেই যুদ্ধবিরতি? আমরা সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, আমার হাতে কখনও কোনও অস্ত্র ছিল না।”
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও বাস্তবতা
জাতিসংঘের সূত্র অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহারের শর্ত ছিল। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন রূপ নিয়েছে। গাজার ৮১ শতাংশ ভবন ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৭০ শতাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতির মাঝেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আইডিএফ-কে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর থেকে গাজায় এই পর্যন্ত মোট ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার পার হয়েছে।



