যে বাড়িতে বিয়ের সানাই বাজার কথা ছিল, সেই বাড়িতে এখন কান্নার রোল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুক্রবার (১৫ মে) দুই ভাইয়ের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই দুই ভাইয়ের সঙ্গে আরও দুই ভাই দেশে ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার রাশেদ, শাহেদুল, সিরাজ ও শহিদ নামের চার আপন ভাই ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় গাড়ির এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে অসুস্থ বড় ভাই রাশেদকে চিকিৎসক দেখাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান বাকি তিন ভাই। সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়ির ভেতর এসি চালিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ গাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় ভেতরে বিষাক্ত কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে চারজনই একে একে অচেতন হয়ে পড়েন।
শেষ মুহূর্তের বার্তা
মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে এক ভাই তার বন্ধু পারভেজকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সেই আর্তনাদ ছিল— 'পারভেজ তুরা কোথায়? আমার বদ্দাকে (বড় ভাইকে) ডাক্তারের কাছে এনেছি, এখন আমরা গাড়ি থেকে নামতে পারছি না... আমাদের চারজনকেও নিয়ে যাও...।' কিন্তু সাহায্য পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় চার রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রাণ।
দূতাবাসের তথ্য
ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানান, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে গাড়ির এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসকেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মরদেহগুলোতে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বর্তমানে মরদেহগুলো ওমান পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ শেষে আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে মরদেহগুলো দেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সতর্কবার্তা
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রবাসীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে— দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে এসি চালিয়ে বসে থাকলে জানালার গ্লাস অবশ্যই সামান্য খোলা রাখতে হবে।
পরিবারের শোক
বৃহস্পতিবার সকালে রাঙ্গুনিয়ার লালানগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে বাড়িতে আজ উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন চার লাশের অপেক্ষা। অসুস্থ মা ফরিদা বেগমকে এখনো ছেলেদের মৃত্যুর খবর পুরোপুরি জানানো হয়নি। পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা ভাই এনাম শোকে বাকরুদ্ধ। ওমানের চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী এই ঘটনাকে প্রবাসের ইতিহাসে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পুরো রাঙ্গুনিয়াজুড়ে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে।



