উত্তর আমেরিকায় ৪৮ দলের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। তবে, মাঠের উত্তাপ বাড়ার আগেই নতুন এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবারের বিশ্বকাপে তাপজনিত ঝুঁকি ১৯৯৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে উঠবে।
গবেষণার মূল ফলাফল
জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের (ডব্লিউডব্লিউএ) প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এবারের টুর্নামেন্টে অনেক ম্যাচই উচ্চ আর্দ্রতাসহ তীব্র গরমের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এতে শুধু ফুটবলার নয়, দর্শক ও স্টেডিয়ামের কর্মীরাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি ভেন্যুতে ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত সম্ভাব্য আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে করা হয়েছে। এতে ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার (ডব্লিউবিজিটি) সূচক ব্যবহার করা হয়, যা আর্দ্রতা, সূর্যের তাপ ও বাতাসের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মানবদেহ কতটা কার্যকরভাবে শরীর ঠান্ডা রাখতে পারছে তা নির্ধারণ করে।
গবেষকদের মতে, অন্তত ১০৪টি ম্যাচের ২৫ শতাংশ ম্যাচ ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় অনুষ্ঠিত হবে। ডব্লিউডব্লিউএ জানিয়েছে, ২৬ ডিগ্রি ডব্লিউবিজিটি মানে মাঝারি থেকে উচ্চ আর্দ্রতায় প্রায় ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা বা শুষ্ক আবহাওয়ায় প্রায় ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রার সমতুল্য।
বিশেষজ্ঞ মতামত
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক ও গবেষণাটির সহলেখক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মে বিশ্বকাপ আয়োজনের সক্ষমতার ওপর বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ খুব বেশি পুরোনো মনে না হলেও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রায় অর্ধেক তখন থেকে ঘটেছে।”
কেন বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্দ্র গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে দ্রুত ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে তাপজনিত অবসাদ, হিট স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
২০১০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, টানা ছয় ঘণ্টা ৩৫ ডিগ্রি ওয়েট বাল্ব তাপমাত্রায় থাকলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। আর ২০২৬ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ৩৫ ডিগ্রির নিচেও ঝুঁকি বাড়ছে।
ফুটবলারদের উচ্চগতির দৌড় ও সরাসরি সূর্যের নিচে খেলার কারণে তাদের সহনশীলতা ও পারফরম্যান্সেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ফিফপ্রোর সতর্কতা
পেশাদার ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রো জানিয়েছে, ডব্লিউবিজিটি ২৬ ডিগ্রিতে পৌঁছালে তাপজনিত ঝুঁকি বাস্তব হয়ে ওঠে এবং তখন কুলিং ও পানির বিরতি প্রয়োজন হয়। ২৮ ডিগ্রি বা তার বেশি হলে খেলা স্থগিতের পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। তবে ফিফা জানিয়েছে, ডব্লিউবিজিটি ৩২ ডিগ্রির বেশি না হলে ম্যাচ স্থগিতের কথা বিবেচনা করা হবে না।
যেসব ভেন্যুতে ঝুঁকি বেশি
গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চল, মধ্য-পশ্চিম এবং আর্দ্র উপকূলীয় এলাকার স্টেডিয়ামগুলোতে তাপঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকবে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছয়টি স্টেডিয়াম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম, ফিলাডেলফিয়ার লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড, কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম, মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম, বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়াম এবং মেক্সিকোর এস্তাদিও মনতেরে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মায়ামিতে উচ্চ তাপমাত্রার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। সেখানে একাধিক ম্যাচ ২৬ ডিগ্রি ডব্লিউবিজিটির ওপরে অনুষ্ঠিত হতে পারে। অন্যদিকে, ডালাস ও হিউস্টনে ২৬ ডিগ্রির বেশি ডব্লিউবিজিটি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে, এই দুই স্টেডিয়ামে শীতলীকরণ ব্যবস্থা রয়েছে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস



