ওমানে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যু সামনে নিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর অথচ প্রায় অদৃশ্য ঝুঁকিকে। গাড়ির কাচ বন্ধ, এসি চালু, ক্লান্ত শরীর—সবকিছু হয়তো তখন স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই গাড়ির ভেতরেই ধীরে ধীরে জমছিল বিষাক্ত গ্যাস। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটিই কেড়ে নেয় চারটি তরতাজা প্রাণ।
ঘটনার বিবরণ
রয়্যাল ওমান পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এক্সহস্ট বা নির্গত ধোঁয়া থেকে উৎপন্ন কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৩ মে) রাতে বারকা থেকে মুলাদ্দাহর পথে রওনা হয়েছিলেন চার ভাই। রাত আটটার পর তাদের একজন আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানান, তারা অসুস্থ বোধ করছেন। গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থাও নেই। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, নাক-মুখে ফেনা আসছে। মায়ের কাছেও ফোন করে দোয়া চান তারা। পরে একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে তাদের মরদেহ।
এই ঘটনাই আবার মনে করিয়ে দিলো—বন্ধ গাড়ির ভেতর কখনও কখনও মৃত্যুও নীরবে ঢুকে পড়তে পারে।
অদৃশ্য এক ঘাতক
কার্বন মনোক্সাইড এমন একটি বিষাক্ত গ্যাস, যার কোনও রং নেই, গন্ধ নেই, স্বাদও নেই। ফলে মানুষ বুঝতেই পারে না কখন এটি শরীরে ঢুকছে। পেট্রোল, ডিজেল বা গ্যাস পুরোপুরি না পুড়লে এই গ্যাস তৈরি হয়। সাধারণ অবস্থায় গাড়ির এক্সহস্ট পাইপ দিয়ে তা বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু এক্সহস্টে ত্রুটি থাকলে, অথবা গাড়ি দীর্ঘসময় বন্ধ অবস্থায় চালু থাকলে সেই গ্যাস আবার ভেতরে ঢুকে জমতে পারে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এসি চালু থাকলেই যে নিরাপদ থাকা যাবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। বরং কাচ পুরোপুরি বন্ধ থাকলে গ্যাস জমে থাকার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
শরীরের ভেতরে কী ঘটে?
কার্বন মনোক্সাইড শরীরে ঢোকার পর রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে অক্সিজেনের চেয়েও দ্রুত মিশে যায়। ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে অক্সিজেন হারাতে থাকে। শুরুর দিকে সাধারণ কিছু উপসর্গ দেখা দেয়: মাথা ব্যথা; মাথা ঘোরা; দুর্বল লাগা; বমি বমি ভাব; শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে। মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, শরীর অবশ হয়ে আসে, এমনকি গাড়ি থেকে বের হওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলতে পারে। অনেক সময় অচেতন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না তিনি মৃত্যুঝুঁকিতে আছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্বন মনোক্সাইডকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হয় মূলত এই কারণেই।
কেন বাড়ছে এই ঝুঁকি?
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচণ্ড গরমের কারণে অনেক প্রবাসী গাড়ির ভেতরে এসি চালু রেখে বিশ্রাম নেন। কেউ কেউ দীর্ঘ ডিউটির পর কিছু সময় ঘুমিয়েও পড়েন গাড়ির ভেতরেই। কিন্তু গাড়ির এক্সহস্ট পাইপে সামান্য লিক, ইঞ্জিনের ত্রুটি কিংবা বদ্ধ পরিবেশ—যেকোনও কিছু মুহূর্তেই বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো গাড়ি, অনিয়মিত সার্ভিসিং এবং সচেতনতার অভাব এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
যেসব ভুল প্রাণঘাতী হতে পারে
- গাড়ি চালু রেখে দীর্ঘসময় ঘুমানো
- সম্পূর্ণ কাচ বন্ধ রেখে এসি চালু রাখা
- গ্যারেজ বা আধাবদ্ধ জায়গায় ইঞ্জিন চালু রাখা
- এক্সহস্ট পাইপে ত্রুটি থাকা
- ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ির ভেতরে দীর্ঘসময় বসে থাকা
কীভাবে সতর্ক থাকা যায়?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যত ক্লান্তিই লাগুক, চালু গাড়ির ভেতরে ঘুমানো উচিত নয়। নিয়মিত গাড়ির এক্সহস্ট ও এসি সিস্টেম পরীক্ষা করানো জরুরি। গাড়ির ভেতরে হঠাৎ মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বের হতে হবে। অনেক দেশে এখন গাড়ি বা বাসাবাড়িতে কার্বন মনোক্সাইড ডিটেক্টর ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে।
কয়েক মিনিটের অসতর্কতা, আজীবনের শোক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্বন মনোক্সাইডের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি মানুষকে চিৎকার করারও সুযোগ দেয় না। নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে, অজান্তেই মৃত্যু কাছে চলে আসে। আর তাই বন্ধ গাড়ির ভেতরে সামান্য অসতর্কতাও কখনও কখনও হয়ে উঠতে পারে জীবনের শেষ ভুল।



