বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানি পরিস্থিতি চরম নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহারে বরেন্দ্রভূমি ‘খুনের’ শিকার হতে যাচ্ছে। বৃহত্তর এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ রুগ্ন পরিস্থিতি প্রতিভাত হচ্ছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন কার্যক্রমে এ বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ অঞ্চলজুড়ে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেবল চাষাবাদই বিঘ্নিত হচ্ছে না, মানুষ খাবার পানির সংকটের শিকার।
সংকটের ভিত্তি বিএমডিএ-এর হাতে
১৯৮৫ সালে বরেন্দ্র ভূমির উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে বরেন্দ্র সমন্বিত অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হয়, যা ১৯৯০ সালে সমাপ্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ১৫ জুন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে নতুন প্রকল্প পুনঃসংস্থাপিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় ১১ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশনা ছিল— যার মধ্যে বিএমডির ছিল ৮ হাজার ৪০০টি। বর্তমানে সেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলিয়ে গভীর নলকূপের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার । এ বিষয়ে সরকারের দেওয়া ১১ দফা নির্দেশনা প্রতিপালন করা হচ্ছে না। বিএমডিএ নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপনের অনুমতি না দিলেও, যেসব গভীর নলকূপের লেয়ার ফেল করেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা স্থান পরিবর্তন ও নতুনভাবে বোরিং করে লেয়ার আরও নিচে নামানো হচ্ছে।
এ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব যে এত ভয়াবহ হবে, কর্তৃপক্ষের হয়তো সেটা ফোরকাস্ট করার টেকনিক্যাল স্কিল ছিল না। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রয়াত ড. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে দুয়েকবার কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তিনি এরকম পানিশূন্য বরেন্দ্র চেয়েছিলেন বলে মনে হয়নি। তিনি মূলত কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এ অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু পানি বাণিজ্যিক পণ্য হবে, রাজনীতির অংশ হবে এবং পানি ঘিরে নতুন সামাজিক শ্রেণি উত্থান হবে, তা হয়তো তিনি ভাবেননি। পরিবেশ সুরক্ষায় তিনি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় প্রকল্পটি ‘মিসফায়ার’ হয়েছে।
ঘরে ঘরে মর্টার, নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা
একসময় পানি ছিল ‘কমনগুড’। গ্রামের দুই-তিনটি পুকুর, ইদারা বা হাতলওয়ালা টিউবওয়েল থেকে সবাই ব্যবহার করতো। পানি ছিল কমিউনিটি শেয়ার রিসোর্স। সেই জায়গায় আকাশ-পাতাল পরিবর্তন এলো। এখন ভূ-উপরিস্থ পানির পরিবর্তে মানুষ শতভাগ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার একটি ছোট্ট গ্রাম চকতাঁতীহাটি, সেখানে রয়েছে ২৬টি খানা। এর মধ্যে ২১টি খানামালিকের উদ্যোগে মর্টারচালিত পানির ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
একটি মর্টার বসাতে গুনতে হয় ২৮-৩০ হাজার টাকা। একজন ব্যক্তি প্রতিদিন ৩০-৩৫ লিটার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছে। ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার শূন্য। সাধারণ থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে পানির ব্যবহার মালিকানা স্বতন্ত্র এক সংস্কৃতি তৈরি করলো। মুরগির খামার, ছোট উদ্যোগ দেখিয়ে পল্লি বিদ্যুৎ থেকে অনুমতি নিয়ে মর্টারগুলো বসানো হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১০-২০ বিঘা পর্যন্ত জমি চাষাবাদ করা হচ্ছে। মর্টারের সংখ্যা পরিমাণ করা সম্ভব নয়। গভীর নলকূপের পাশাপাশি এসব মর্টার দিয়ে পানি নামের হিরককণা। পানির সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যকে বাণিজ্যিক মূল্যে রূপান্তর করা হয়েছে। এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর হতে পারে না।
গভীর নলকূপ স্থাপনে দ্বৈত শাসন ও সমন্বয়হীনতা
বিএমডিএ এবং উপজেলা সেচ কমিটি বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে। উপজেলা সেচ কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে গভীর নলকূপ বসানো হয়। একটি গভীর নলকূপ বসাতে খরচ হয় ২০-২২ লাখ টাকা। ব্যক্তিগত গভীর নলকূপের সুনির্দিষ্ট খরচের হিসাব পাওয়া যায়নি। বিএমডিএ’র গভীর নলকূপে ড্রেনেজ সিস্টেম পাকা হওয়ায় পানির অপচয় কম। ব্যক্তিগত মালিকানার গভীর নলকূপে ড্রেনেজ উন্নত না হওয়ায় পানির অপচয় বেশি। ব্যক্তিগত মালিকানার গভীর নলকূপের পানির মূল্য বিএমডিএ’র গভীর নলকূপের তুলনায় বেশি।
সরেজমিন তথ্যে দেখা গেছে, বিএমডিএ’র আওতায় এক বিঘা জমি চাষ করতে একজন কৃষককে ১ হাজার ৫০০ টাকার বিদ্যুৎ বিল (কার্ড) এবং অপারেটরকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। অন্যদিকে ব্যক্তিগত নলকূপে এক বিঘা জমি চাষ করতে অনেক সময় তার চেয়েও বেশি খরচ গুনতে হয়। তবে এই খরচ কমবেশি হয়। ব্যক্তিগত নলকূপে পানির বাণিজ্যিক ব্যবহার বেশি। কিছু কিছু জায়গায় বিএমডিএ গভীর নলকূপগুলো সমিতি দ্বারা পরিচালিত হয়। সমিতি দ্বারা পরিচালিত গভীর নলকূপগুলোর পরিচালন ব্যবস্থা অন্যগুলোর চেয়ে ভালো। এখানে কৃষকের স্বার্থ কিছুটা সুরক্ষিত হয়। কারণ, এসব গভীর নলকূপ পরিচালনায় কৃষকের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে।
ব্যক্তিগত নলকূপে পানির মূল্য নির্ধারিত হয় মালিকের ইচ্ছায়। আর বিএমডিএ’র ক্ষেত্রে নীতিমালার অনুসরণে। এ অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় বিএমডিএ ও উপজেলা সেচ কমিটির দ্বৈত শাসন ও সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা গেছে। গভীর নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রে বিএমডিএ নির্ধারিত দুই হাজার ফুটের সীমারেখা বিবেচনা না করে অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা সেচ কমিটি ব্যক্তিমালিকানায় গভীর নলকূপ স্থাপনের অনুমতি দিচ্ছে।
ভূ-উপরিস্থ পানিচিত্র কী দাঁড়ালো
বাস্তবতা হলো, চাষাবাদে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। কারণ, এক ফসলি জমি হয়েছে তিন ফসলি। বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ সূত্র জানা গেছে, চাষাবাদে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার হয় মাত্র ২২ শতাংশ। বাকিটা আসে মাটির নিচ থেকে।
ভূ-উপরিস্থ পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব সরকারি পুকুর ছিল সেগুলো ছিল বড় উৎস। সমিতি করে ভূমিহীনদের মধ্যে পুকুরগুলো ইজারার বিধান থাকলেও বিভিন্ন সময় শাসকগোষ্ঠীর স্থানীয় নেতারা নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে পুকুরগুলো ইজারা নিচ্ছে এবং মাছ করছে। এ কারণে সেসব পুকুর থেকে কৃষকেরা এক ছটাক পানিও সেচ কাজে ব্যবহার করতে পারছে না।
অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরগুলো ইজারা ব্যক্তি বা প্রজেক্টের আওতায় চলে যাওয়ায় সেগুলো থেকেও পানি ব্যবহারের কোনও সুযোগ নেই। একইসঙ্গে, খাল, খাড়ি বা নদী দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় সেগুলোতেও নাব্য হ্রাস পেয়েছে। ফলে চাষাবাদসহ নিত্য ব্যবহারে ভূ-গর্ভস্থ পানিই প্রধান অবলম্বন।
ভূ-গর্ভস্থ পানি সংকটাপন্ন হটস্পটগুলো
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে— রাজশাহী, নওগাঁ ও চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার ২৫টি উপজেলা পানি সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১৪৬৯ মৌজাকে অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা এবং ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজাকে উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আর এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। সরেজমিন তথ্যে দেখা গেছে ১২ জুন ১৯৮৪-তে পানি উন্নয়ন বোর্ড তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ৮-১০ ফুট। ২০২৬ সালের চলতি সপ্তাহে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৮০ ফুট। ৪০ বছরে তা প্রায় আট গুণ নিচে নেমেছে। নওগাঁ ও চাপাইনবাবগঞ্জের উঁচু এলাকাগুলোতে কোথাও কোথাও তা ৭৫০-১০০০ ফুটে ঠেকেছে।
অ্যাকুইফার বা সিক্ত শিলাস্তর হারাচ্ছে পানিধারণ ক্ষমতা
গবেষণায় উঠে এসেছে ভূ-গর্ভে পানি ধরে রাখার জন্য অ্যাকুইফার বা পানি ধারক স্তর থাকে তা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে পানি ধরে রাখার গুণগত মান হারাচ্ছে। অ্যাকুইফারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য— তা একবার শুকিয়ে গেলে তার মৌল চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে অনেক এলাকা ভূ-ভাগের নিচে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এমনকি কিছু পানিশূন্য ব্লক তৈরি হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনূরা এলাকায়। যেখানে অনেকগুলো ধানের চাতাল ও গভীর নলকূপ রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি তোলার কারণে এখন আর পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনগণ পড়েছে চরম ভোগান্তিতে।
কী পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে
একটি গভীর নলকূপে প্রতি সেকেন্ডে ৫৬ লিটার পানি উত্তোলন করা যায়। গত ৪০ বছরে কী পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হলো, তার হিসাব কে করবে? পানির মতো পাবলিক গুডের প্রকৃত মালিক যে জনগণ, তা স্বীকার করা হচ্ছে না। ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও বিক্রি করে মুনাফা লুট হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২০০ লিটার পানি। তাহলে গত প্রায় ৪০ বছরে বিএডিসি ও বিএমডিএ কী পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করল এবং এ পানি, জৈব-বৈচিত্র্য, পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য থেকে যোগ-বিয়োগ করলে হিসাব পরিষ্কার হয়ে যায়। মাঠে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, গত দুই দশকে চাষাবাদে পানির দাম বেড়েছে ৭ গুণ।
‘ওয়াটার-এলিট’, অন্যটি ‘ওয়াটার-টাউট’ শ্রেণির উত্থান
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা ঘিরে ‘ওয়াটার-এলিট’, ‘ওয়াটার-টাউট’ শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। তা গড়ে উঠেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও উপজেলা সেচ কমিটির হাতে। এ দুই শ্রেণি, বিএমডিএ ও উপজেলা সেচ কমিটি মিলে এ অঞ্চলের পানির ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।
গভীর নলকূপের মাধ্যমে তোলা ভূ-গর্ভস্থ পানি ও চাষাবাদ পদ্ধতি এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কে সমূলে বদলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর ফেলছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব।
পানির ওপর সর্বজনীন অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। প্রতি ফোঁটা পানির অর্থমূল্য তৈরি হয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানি এ অঞ্চলে রাজনীতির এক নিবিড় ব্যাকরণ। গভীর নলকূপ কেবল নলকূপ নয়, পাওয়ার হাউজও বটে। এজন্য ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে গভীর নলকূপের অপারেটর পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এ অপারেটরেরা কোন কৃষক আগে বা পরে পানি পাবেন, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। কৃষকের পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে অপারেটরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
গভীর নলকূপের অপারেটর: রাজনৈতিক নেক্সাস ও নগদজীবী শ্রেণির বিকাশ
গভীর নলকূপের অপারেটররা ক্ষমতাবান সমর্থক হন। দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। রাজনৈতিক অনুগত্য থাকলেও পয়সা খরচ করে তাকে পদটি নিতে হয়। অপারেটরকে বিএমডিএ ঘণ্টা প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দিয়ে থাকে। এতে একজন অপারেটর গভীর নলকূপের ব্যবহারের ভেদে বছরে দশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন।
এখানেই শেষ কথা নয়, গভীর নলকূপকে ঘিরে যে প্রকল্পভিত্তিক চাষাবাদ শুরু হয়েছে সেখানে বাইরের লগ্নিকারীরা গভীর নলকূপের আওতাভুক্ত জমিতে বিনিয়োগ করেন। অপারেটরেরা এখানে মধ্যস্বত্ত্বভোগী। আলু চাষের জন্য কৃষককে হয়ত বিঘাপতি পনের হাজার টাকা দেন কিন্তু তিনি লগ্নিকারীর কাছ থেকে নেন ১৬ বা ১৭ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি এক হাজার বা দুই হাজার টাকা অপারেটরের বাড়তি লাভ। ধরা যাক, প্রকল্পের আওতায় দুই শত বিঘা জমি রয়েছে, কোনও বিনিয়োগ ছাড়া অপারেটরের হাতে আসবে চার লাখ টাকা।
রাজনীতিঘনিষ্ট অপারেটরদের সঙ্গে কৃষকদের সুসম্পর্ক রেখে চলতে হয়। অপারেটরা কৃষকদের মধ্যে তাদের প্রতি নানারকম নির্ভরতা তৈরি করে। সার-বীজের ডিলারদের সঙ্গেও অপারেটরদের ভালো যোগাযোগ থাকে। তাদের সামাজিক গতিশীলতা বেশি। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেমন-মামলা মোকদ্দমা, চিকিৎসা, আপদ-বিপদে কৃষকরা তাদের ওপর নির্ভর করে। এভাবে অপারেটরেরা গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোতে নতুন শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ভূ-গর্ভস্থ পানির মালিকানা চলে গেছে নতুনভাবে গজিয়ে ওঠা রাজনীতিলগ্ন নগদজীবী বা ক্যাশবেইজ শ্রেণির হাতে। যাদের তেমন জমিজিরাত নেই কিন্তু রয়েছে টাকা। এ শ্রেণি পানির ব্যবসা করে, পুকুর ইজারা নেয়, মাছ চাষ করে, আলু-পেয়ারা বা আমের প্রজেক্ট করছে, চলছে ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সখ্য মিলিয়ে।
অপারেটরা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন
ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট একমাত্রিক নয়। কৃষকের সিদ্ধান্ত ও জমির ওপর মালিকানাবোধও বদলে দিচ্ছে। একটি গভীর নলকূপের আওতায় থাকা দশ কাঠা জমি কৃষক তাঁর মতো করে চাষের অধিকার হারাচ্ছেন। কারণ, বিএমডিএ’র হোক বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন গভীর নলকূপ হোক, প্রকল্পের আওতায় চাষাবাদের ক্ষেত্রে অপারেটরের সিদ্ধান্ত অগ্রগণ্য। কৃষককে বলতে শোনা যাচ্ছে, কেবল কাগজ-কলমে আমার জমি রয়েছে কিন্তু বাস্তবে মালিকানা অনুভব করতে পারি না। কারণ, আমি স্বাধীনভাবে ফসল চাষাবাদ করতে পারছি না। পানির জন্য অপারেটর বা গভীর নলকূপের মালিকের ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষি কাজে পানি অন্যতম প্রধান উপাদান। সুতরাং যারা পানি নিয়ন্ত্রণ করছে তারাই কৃষকের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। গভীর নলকূপ রাজনৈতিক ক্ষমতার দাওয়া হয়ে উঠেছে। কৃষক অসহায়, বিভক্ত। মধ্যস্বত্বভোগী ও লগ্নিকারীরা সংঘবদ্ধ। সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকে কেবল পানি বেচে তারা মুনাফা তুলে নিচ্ছে। প্রজেক্টভিত্তিক চাষাবাদে পড়ে কৃষক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে। এ প্রবণতা কৃষিতে নয়া উপনিবেশবাদ বলে চিহ্নিত করা যায়।
ব্যর্থতার পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ হতে যাচ্ছে
দেশে জাতীয় পানিসম্পদ কাউন্সিল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, কমিশন নিয়ে এ কাউন্সিল গঠিত। রয়েছে জাতীয় পানি পরিকল্পনা, জাতীয় পানি নীতি, পানি আইন ও বদ্বীপ পরিকল্পনা। আরও রয়েছে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ অর্জনে বিশেষ অঙ্গীকার। কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি সুরক্ষায় এসব দলিল নিষ্ফলা প্রমাণিত হচ্ছে। নীতিপরিকল্পনা আর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা অসফলতা পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ হতে যাচ্ছে।
একটি রাষ্ট্র কতটুকু দক্ষ, কতটুকু ডেলিভার করতে পারে তা বোঝা যায় জনগণের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তার দক্ষতার ওপর। তাৎক্ষণিক উন্নয়ন যদি ভবিষ্যতের জন্য বোঝা বা আপদ হয়, তাহলে কি তাকে উন্নয়ন বলা যাবে? বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির নির্বিচার ব্যবহার সেরকম ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশন বাড়বে, মানুষের অস্তিত্ব, জীবন-জীবিকা, জনস্বাস্থ্য কঠিন সংকটে পড়বে। কারণ, পানি ছাড়া কোনও প্রাণ বাঁচতে পারে না। কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে কিন্তু তা ভয়াবহতার তুলনায় অপ্রতুল। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এ উদ্বেগজনক বিপর্যয় রোধে সরকারের পক্ষ থেকে আশু করণীয় নির্ধারণ জরুরি।



