টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের সাঙ্গু নদের পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার সব কটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আজ সকাল ৯টায় সাতকানিয়া অংশে সাঙ্গু নদের পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, যা গত কয়েক দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাঙ্গুর পাশাপাশি ডলু, টঙ্কাবতী, মাইনী ও চেঙ্গী নদীর পানিও বেড়েছে।
পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ
জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়ায় পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। উপদ্রুত অনেক এলাকায় নলকূপ ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। উপজেলা সদরগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
পাহাড়ধসে মৃত্যু
ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে গতকাল বুধবার দিবাগত রাত একটায় কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে দুজন এবং আজ বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামার মিশনপাড়ায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলায় পাহাড় ও দেয়ালধসে ২৯ জনের মৃত্যু হলো।
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা প্লাবিত
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গতরাতেই দুই উপজেলার সব কটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ ও থানা এলাকায় কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে গিয়ে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন আছে। এ অঞ্চলের নদীগুলোর স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নেই; গ্রামীণ সড়কগুলোই প্রতিরক্ষা বাঁধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল পানির নিচে। তবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতরাতেই উপজেলার সব কটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছি। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে উদ্ধার টিম গঠন করা হয়েছে।’
আগামী ৪৮-৭২ ঘণ্টায় আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা
পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার আজ বেলা ১১টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করতে হবে।’
দীঘিনালা ও সাজেকে বিদ্যুৎ বন্ধ
বন্যার পানিতে দীঘিনালা উপজেলার ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে (সাবস্টেশন) পানি ওঠায় নিরাপত্তার স্বার্থে বুধবার বিকেল থেকে দীঘিনালা উপজেলা ও সাজেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে দীঘিনালা উপজেলা এবং সাজেকের আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মুঠোফোন চার্জ, ইন্টারনেট সংযোগ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বাঁশখালীতে পানি কমছে না
বৃষ্টি বন্ধ না হওয়ায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো ডুবে আছে। পানি কমার কোনো লক্ষণ নেই। উপজেলার অধিকাংশ ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে; কোনো কোনো জায়গায় তিন থেকে চার ফুটের বেশি পানি জমে গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, চার দিনের প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ি ঢল নেমে পাহাড়ি ইউনিয়নগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অপরদিকে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা উপজেলার ১১০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রেখেছি। বুধবার ইউনিয়নগুলোতে সাড়ে ২৪ টন চাল পাঠানো হয়েছে। জরুরি মুহূর্তে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শুকনা খাবার পাঠানো হবে।’
খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালায় বাড়ছে পানি
কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। একের পর এক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয় নেওয়া মানুষদের জন্য খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।



